সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার পর ভ্রমণবিষয়ক তথ্যচিত্র বানাতে পাঁচ বছর আগে সহকর্মীদের নিয়ে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন সিনহা মো. রাশেদ খান। তখন করোনাভাইরাস মহামারির কবলে দেশ। সে সময় কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের শামলাপুর চেকপোস্টে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল সেনা কর্মকর্তা সিনহাকে।
এই হত্যাকাণ্ডের দায়ে তখনকার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ (বরখাস্ত) ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে (বরখাস্ত) মৃত্যুদণ্ড আর ছয় জনকে যাবজ্জীবন দিয়েছিলেন কক্সবাজারের আদালত।চলতি বছর ২ জুন বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও বিচারপতি মো. সগীর হোসেনের বেঞ্চ বিচারিক আদালতের রায় বহাল রেখে রায় দেন। মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের (ডেথ রেফারেন্স) আবেদন মঞ্জুর ও দণ্ডিতদের আপিল খারিজ করে এই রায় দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিচারিক আদালতের রায়ে যাদের খালাস দেওয়া হয়েছিল, সেই খালাসের বিরুদ্ধে মামলার বাদীর ফৌজদারি আবেদনটিও খারিজ করা হয়।
এ রায় ঘোষণার প্রায় পাঁচ মাস পর আজ রবিবার পূর্ণাঙ্গ রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।‘রাষ্ট্র বনাম মো. লিয়াকত আলী এবং অন্যান্য’ শিরোনামে ৩৭৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি লিখেছেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান।রায়ে সিনহা হত্যাকাণ্ডের বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, সিনহা মো. রাশেদ খান ২০১৮ সালে ব্যক্তিগত কারণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। পরে তিনি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ভ্রমণ, পর্যটনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড শুরু করেন।এসব কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে তিনি ‘জাস্ট গো’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল খোলেন। এই চ্যানেলের কাজেই তিনি ২০২০ সালের ২ জুলাই সহকর্মী সাহেদুল ইসলাম সিফাত, শিপ্রা দেবনাথ ও রুপ্তিসহ চারজন ককক্সবাজার গিয়েছিলেন। এই চ্যানেলের জন্যই কক্সবাজার শহর, টেকনাফ, রামু এলাকারসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে পর্যটনসংক্রান্ত ভিডিও তৈরি করছিলেন। ভিডিও তৈরি করতে গিয়ে টেকনাফ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ ও পুলিশ পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলী সম্পর্কে স্থানীয়দের কাছ থেকে অভিযোগ পান। জুলাইয়ের মাঝামাঝি কোনো একদিন মেরিন ড্রাইভে লিয়াকত আলী ও প্রদীপ কুমার দাশের সঙ্গে সিনহা ও তাঁর সঙ্গীদের দেখা হয়।
তখন ওসি প্রদীপের কাছে স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চান সিনহা। আর এতেই খেপে যান প্রদীপ কুমার দাস। তিনি সিনহার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং সিনহাকে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলেন।সিনহা হত্যাকাণ্ডটি ঘটে ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে। ওই দিন সিনহা ও তাঁর সঙ্গীরা মারিশবুনিয়া এলাকার মুইন্না পাহাড়ে উঠে ভিডিও ধারণ করেন। এ কাজ করতে গিয়ে রাত সাড়ে ৮টা বেজে যায়। সেখান থেকে তাঁরা রিসোর্টে ফিরছিলেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের বাহারছড়া শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে পৌঁছালে সেখানে তাঁদের গাড়ি থামানো হয়। এক পর্যায়ে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হাত উঁচু করে গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ান সিনহা। নিজের পরিচয় দেন।তখন লিয়াকত আলী ‘শ্যুট শ্যুট’ বলে সিনহাকে দুই রাউন্ড গুলি করেন। দুই হাত উঁচু করেই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তখন লিয়াকত আলী এগিয়ে এসে আবার দুই রাউন্ড গুলি করলে সিনহা ওপুর হয়ে পড়ে যান। এ অবস্থায় পিছমোরা করে হাতকড়া পরানো হয়। এক পর্যায়ে লিয়াকত আলীর কাছে সিনহা পানি চাইলে গালি দিয়ে সিনহার কোমরে লাথি মারেন লিয়াকত। এর কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে আসেন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। উপুর হয়ে পড়ে থাকা মরণাপন্ন সিনহার কাছে গিয়ে প্রদীপ তখন বলেন, ‘অনেক টার্গেট করে তোকে মেরেছি’। ওসি প্রদীপ পা দিয়ে সিনহার শরীরে নাড়া দিলে সিনহা তখন প্রদীপের কাছে পানি চান। অকথ্য ভাষায় গালি দিয়ে প্রদীপ তখন সিনহার বাঁ বুকে কয়েকটি লাথি মারেন এবং বুট জুতা দিয়ে তাঁর গলার বাঁ দিকে চেপে ধরেন। তখন সিনহার শরীর কাঁপতে কাঁপতে এক পর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে যান। এভাবেই ওসি প্রদীপ মেজর সিনহার মৃত্যু নিশ্চিত করেছিল বলে ঘটনার বর্ণনায় উল্লেখ করেছেনে হাইকোর্ট।
এ ঘটনায় সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস ২০২০ সালের ৫ আগস্ট বাদী হয়ে কক্সবাজার আদালতে টেকনাফের বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে প্রধান করে নয় পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। মামলায় টেকনাফ মডেল থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে করা হয় দুই নম্বর আসামি। এ মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় র্যাবকে। ২০২০ সালের ১৩ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. খাইরুল ইসলাম ওসি প্রদীপসহ ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। একই দিন পুলিশের দায়ের করা মামলা তিনটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে বরখাস্ত ওসি প্রদীপ ও এসআই লিয়াকতকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আর ছয় আসামিকে দেওয়া হয়েছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। সেই রায়ই বহাল রেখে গত ২ জুন রায় দেন উচ্চ আদালত।
এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ..