মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে বই শুধু জ্ঞানের ভাণ্ডার নয়, বরং চিন্তার স্বাধীনতা, সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা এবং সৃজনশীলতার সবচেয়ে শক্তিশালী বাহন। এই মূল্যবোধকে সামনে রেখেই প্রতিবছর পালিত হয় জাতীয় গ্রন্থ ও গ্রন্থস্বত্ব দিবস। ২০২৬ সালেও দিনটি নতুন প্রত্যয় নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত—বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, লেখক–প্রকাশকের অধিকার রক্ষা করা এবং সৃজনশীল কাজের প্রতি সম্মান বাড়ানোর আহ্বান নিয়ে।
বই: জ্ঞানের আলো ও মননের খাদ্য
বই মানুষের চিন্তাকে প্রসারিত করে, যুক্তিবোধ জাগ্রত করে এবং সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রযুক্তির এই দ্রুত পরিবর্তনের যুগে ডিজিটাল মাধ্যম যতই জনপ্রিয় হোক, বইয়ের গভীরতা ও নির্ভরযোগ্যতার বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। একটি ভালো বই পাঠককে শুধু তথ্য দেয় না, তাকে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে।
জাতীয় গ্রন্থ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পড়ার অভ্যাস কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি সামাজিক প্রয়োজন।
গ্রন্থস্বত্ব: সৃজনশীলতার নিরাপত্তা
গ্রন্থস্বত্ব বা কপিরাইট হলো লেখক, গবেষক ও সৃষ্টিশীল মানুষের মেধাস্বত্বের আইনি স্বীকৃতি। একটি বই লিখতে যে শ্রম, সময় ও চিন্তার প্রয়োজন, তার যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করে গ্রন্থস্বত্ব আইন।
অবৈধ নকল, পাইরেসি, অনুমতি ছাড়া পুনর্মুদ্রণ বা অনলাইন কপি—এসব শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, সৃজনশীলতার প্রতি অবিচার।
এই দিবস আমাদের সচেতন করে—
লেখকের অধিকার রক্ষা করতে হবে
অনুমতি ছাড়া কোনো লেখা ব্যবহার করা যাবে না
বই কিনে পড়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে
পাইরেসি বর্জন করতে হবে
ডিজিটাল যুগে বইয়ের নতুন রূপ
২০২৬ সালে এসে বই শুধু মুদ্রিত পাতায় সীমাবদ্ধ নেই। ই-বুক, অডিওবুক, অনলাইন লাইব্রেরি—সব মিলিয়ে পাঠের জগৎ হয়েছে আরও বিস্তৃত। এতে পাঠকের সুবিধা যেমন বেড়েছে, তেমনি গ্রন্থস্বত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জও বেড়েছে।
ডিজিটাল কনটেন্ট সহজে কপি করা যায় বলে সচেতনতা ও আইন প্রয়োগ—দুই-ই এখন বেশি জরুরি।
তরুণ প্রজন্ম ও পাঠাভ্যাস
জাতীয় গ্রন্থ ও গ্রন্থস্বত্ব দিবস তরুণদের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিড়ে বই যেন হারিয়ে না যায়—সেজন্য পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে।
স্কুল–কলেজে পাঠচক্র, বইমেলা, লেখক–পাঠক আলোচনা, গ্রন্থাগার কার্যক্রম—এসব উদ্যোগ পাঠাভ্যাস বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আমাদের করণীয়
এই দিবসে আমরা অঙ্গীকার করতে পারি—
বছরে অন্তত নির্দিষ্ট সংখ্যক বই পড়ব
মৌলিক লেখাকে সম্মান করব
পাইরেটেড বই কিনব না
শিশুদের বই পড়তে উৎসাহ দেব
গ্রন্থাগার ব্যবহারে আগ্রহী হব
শেষকথা
জাতীয় গ্রন্থ ও গ্রন্থস্বত্ব দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়; এটি জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার মর্যাদা রক্ষার দিন। বই আমাদের চিন্তার স্বাধীনতা দেয়, আর গ্রন্থস্বত্ব সেই চিন্তার সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
বই পড়ি, বইকে ভালোবাসি, সৃষ্টিকে সম্মান করি—এই হোক ২০২৬ সালের অঙ্গীকার।
লেখক: মোহাম্মদ তারেকউজ্জামান খান , প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, উত্তরা পাবলিক লাইব্রেরি।