ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের নিহত বিভাগীয় সভাপতি আসমা সাদিয়া রুনা বিগত দেড় বছর ধরে বিভাগে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। সহকর্মীদের অসহযোগিতা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসদাচরণে একাডেমিক ও দাপ্তরিক বিভিন্ন কাজে চরম বিপত্তিতে পড়তেন তিনি। এই প্রতিকূল পরিবেশেও তিনি বিভাগের সভাপতিত্বের কাজ চালিয়ে গেছেন।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিভাগটির সভাপতির দায়িত্ব পান রুনা। এরপর থেকেই বিভাগ সংশ্লিষ্টদের অসহযোগিতা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের শিকার হয়ে আসছিলেন তিনি।
এদিকে খুনি ফজলুর শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীদের আওতায় না থাকায় বিভাগ থেকে মাসিক ছয় হাজার টাকা পেতেন। পরে রুনা সভাপতি হয়ে এক হাজার টাকা বাড়িয়ে তার বেতন সাত হাজার করেন। বিভাগীয় অর্থসংকট কাটাতে গত বছরের নভেম্বরে বিভাগের একাডেমিক সিদ্ধান্তে ফজলুরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনিক মজুরির আওতায় আনা হয়। তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছয় হাজার টাকা পেতেন।
সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে তার দাবির প্রেক্ষিতে বিভাগ আরও চার হাজার বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা দেয়। তবে ফজলুর আগের সাত হাজারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় হাজার মিলিয়ে ১৩ হাজার টাকা দাবি করলে রুনার সঙ্গে তার বিরোধ সৃষ্টি হয়। এরপর থেকে ফজলুর নিয়মিত রুনার সঙ্গে বেয়াদবি ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করতে থাকে।
এর আগেও রুনার সঙ্গে ফজলুরের বিভিন্ন বাজে আচরণের নজির রয়েছে। এজন্য তাকে একাধিকবার লিখিত সতর্কবার্তা দিলে ফজলুর কয়েকবার লিখিতভাবে ক্ষমাও চায়। আচরণে পরিবর্তন না আসায় গত ১ ফেব্রুয়ারি একাডেমিক সিদ্ধান্তে তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়।
সর্বশেষ বদলির পর ফজলুর শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সভাপতি রুনার কাছে তাকে পুনর্বহালের অনুরোধ জানান।
এ নিয়ে রুনা শিক্ষার্থীদের বলেন, মানবিক দিক বিবেচনায় তাকে অনেকবার ক্ষমা করা পরও তোমরা তাকে রাখতে চাইলে আমি চেয়ারম্যানশিপ ছেড়ে দেব। আমি অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলায় সে আমাকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য করে। তার এসব অসদাচরণ কত সহ্য করব?
সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষিকা রুনা তার সহকর্মী শ্যাম সুন্দর সরকার (মামলার ৩ নম্বর আসামি), সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিত কুমার (মামলার ২ নম্বর আসামি) এবং নৈশপ্রহরী সুমনের নানা অসহযোগিতার শিকার হয়ে আসছিলেন। বিশ্বজিত কুমার সভাপতির কাছে বিভাগের হিসাবের ভাউচার-কাগজপত্র বুঝিয়ে না দিয়ে স্বাক্ষর করতে চাপ দিতেন। পরে বিশ্বজিত দাপ্তরিক কাজে অদক্ষ হওয়ায় তাকে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দিকা হলে বদলি করা হয়। বদলির এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও রুনা একাধিকবার তাকে নতুন কর্মকর্তা মোজাম্মেলকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে বললেও তিনি তা গ্রাহ্য করেননি। এদিকে প্রায় দেড় বছর পেরুলেও সাবেক সভাপতি শ্যামসুন্দর রুনাকে পূর্বের ভাউচার ও হিসাব-নিকাশের কাগজপত্র বুঝিয়ে দেননি। বিভাগ থেকে শ্যামসুন্দরকে একাধিকবার অ্যাকাডেমিক মিটিং করে চিঠি দিলেও তিনি তা আমলে নেননি।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, বিশ্বজিতের প্ররোচনায় বিভাগের অন্য কর্মচারীরা রুনা ম্যামের সঙ্গে অসদাচরণ করতো। শ্যাম সুন্দর স্যার চাইতেন, রুনা ম্যাম যেন সভাপতি হিসেবে সফল না হয়। এছাড়া বিভাগের নৈশপ্রহরী সুমনও ম্যামের সঙ্গে বেয়াদবি এবং নির্দেশনা মানতেন না।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. বেগম রোকসানা মিলি বলেন, ফজলুর অশালীন ও অসদাচরণের বিষয়ে রুনা বহুবার অভিযোগ করেছে। কয়েকবার সমাধানও করেছিলাম। একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষও সমাধান করেন। অনেকে ফজলুর বকেয়ার কথা বললেও তার এক মাসের বেতনও বাকি ছিল না। বরং রুনা অনেক চেষ্টা করেই তাকে দৈনিক মজুরির অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
ড. মিলি আরও বলেন, বিশ্বজিত রুনাকে শুধু হিসাব-নিকাশের কাগজ দিয়ে স্বাক্ষর করে দিতে বলতেন। বিশ্বজিত ও শ্যাম সুন্দর তাকে অসহযোগিতা করতেন। এমনকি শ্যাম সুন্দর আগের অনেক হিসাব-নিকাশও বুঝিয়ে দেননি। এ বিষয়ে চিঠি দিলে তিনি বলতেন, ‘আমি যখন ইচ্ছা তখন দেব।’ নৈশপ্রহরী সুমনও রুনার আদেশ মানতেন না। অভিযোগগুলো রুনা ডিন হিসেবে আমার কাছে অনেকবার করেছেন।
বিশ্বজিতের স্থলে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক বলেন, আমি দায়িত্ব পাওয়ার এক সপ্তাহ পার হলেও বিশ্বজিত আমাকে পূর্বের কাজ বুঝিয়ে দেয়নি। তাকে বারবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ তাকে অবহিত করার জন্য একটি চিঠি ইস্যু করা হয়েছিল।