বন্ড লাইসেন্সের আওতায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করে তা রপ্তানির বদলে খোলাবাজারে বিক্রি করছে, এমন সন্দেহভাজন বড় রপ্তানিকারকদের গত পাঁচ বছরের ব্যাংকিং তথ্য সংগ্রহ করছে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ। এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, এসব ব্যাংক লেনদেনের তথ্য কাস্টমসের ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমসহ অন্যান্য ডেটাবেজে থাকা আমদানি ও রপ্তানি তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে, যাতে কোনো অমিল বা অসঙ্গতি ধরা পড়ে।
বন্ড সুবিধার কথিত অপব্যবহারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হন দেশের টেক্সটাইল মিল মালিকরা। এই শিল্প খাতের ব্যবসায়ী নেতাদের অভিযোগ, শুল্কমুক্ত আমদানি করা পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা এবং সরাসরি চোরাচালানের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য বাজারে আসছে, যা স্থানীয় উৎপাদকদের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং সরকারও বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। গার্মেন্টস এক্সেসরিজসহ অন্যান্য পণ্যও এ অপব্যবহারের আওতায় পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনা সরকারের পতনের পর এনবিআর দুই ভাগ করা নিয়ে সৃষ্ট প্রশাসনিক জটিলতায় মাঠ পর্যায়ে তদারকিতে ভাটা পড়ায় এই সময়ে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় শিল্প মালিকদের।টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তারা সতর্ক করে বলেন, এ খাতে বিনিয়োগ করা ২৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের স্থানীয় বিনিয়োগ এখন হুমকিতে পড়েছে, কারণ শুল্কমুক্ত কাঁচামাল অবৈধভাবে স্থানীয় বাজারে বিক্রি হওয়ায় স্থানীয় শিল্পের জন্য অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
রপ্তানিকারকদের শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিয়ে আসছে সরকার, যার অন্যতম শর্ত হলো বিদেশ থেকে আনা কাঁচামাল নির্ধারিত ওয়্যারহাউজ বা গুদামে রেখে তা দিয়ে পণ্য তৈরি করে রপ্তানি করতে হবে। এসব পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে হলে, আগে কাস্টমসের অনুমতি দিয়ে প্রযোজ্য আমদানি কর পরিশোধ করতে হবে, যার হার কাঁচামাল ভেদে ৪০ থেকে ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত।
রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়াতে এই সুবিধা চালু করা হয়েছিল এবং ১৯৮০-এর দশক থেকে এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে, যার ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। তবে একই সময়ে অভিযোগ আসতে শুরু করে, এই সুবিধায় আনা কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন একশ্রেণির অসাধু রপ্তানিকারক, যা স্থানীয় শিল্পের বিকাশে বাধা হিসেবে কাজ করছে। যেখানে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের পূর্ণ শুল্ক দিতে হয়। অর্থনীতিবিদরা বলেন, এ কারণে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে দুই ধরনের ক্ষতি হয়— সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হয় এবং দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে, যা শিল্প বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে।
বছরে কী পরিমাণ বন্ড সুবিধার অপব্যবহার হয়, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে ২০১৬ সালে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান বলেছিলেন, এর পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
ব্যাংক হিসাব যাচাই
এই অভিযানের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন ট্যাক্স অফিস থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং তথ্য চাওয়া হচ্ছে।কর্মকর্তারা জানান, এনবিআরের ৩০টি কর অঞ্চলের বেশির ভাগই ইতিমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছে এবং কিছু অফিস একাধিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য চেয়েছে।নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা কর অঞ্চল-৮-এর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, আমাদের অফিস থেকে সাতটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য চেয়ে ব্যাংকের কাছে অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। অপেক্ষাকৃত বড় আকারের, অর্থাৎ কয়েক কোটি টাকা বন্ড মিসইউজের সন্দেহ রয়েছে—এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাথমিকভাবে তালিকাভুক্ত করে তাদের তথ্য চেয়ে ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যাংকের কাছ থেকে তাদের গত ৫ বছরের লেনদেনের তথ্য পাওয়ার পর কাস্টমসের আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত সফটওয়্যার অ্যাসাইকুডা-তে রক্ষিত তথ্যের সঙ্গে তা ক্রসচেক করা হবে। তথ্যে অসংগতি পাওয়া গেলে, এর ব্যাখ্যা চাওয়া হবে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে।
কী প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, রপ্তানির তথ্যের তুলনায় ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকে লেনদেনের পরিমাণ বেশি হলে এবং এর যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হলে ধরে নেওয়া হবে, শুল্কমুক্ত সুবিধার কাঁচামাল বাইরে (স্থানীয় বাজারে) বিক্রি করা হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, প্রয়োজনে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হিসাবও যাচাইয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।কর অঞ্চল-১৫-এর অপর একজন কর্মকর্তা বলেন, ইতিমধ্যে ৮টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য চেয়ে ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, অন্যান্য কর অফিস মিলিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১০০ এর মতো হবে। তবে দুই কর অফিসই অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের নামের তথ্য জানাতে রাজি হয়নি।
অবশ্য কর অঞ্চল-১৫-এর অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, সন্দেহভাজন যেসব প্রতিষ্ঠানের তথ্য চাওয়া হয়েছে, এই তালিকায় থার্ম্যাক্স গ্রুপের অন্তত দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
শিল্প খাতের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে গত মাসে এনবিআরের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।রাজস্ব কর্তৃপক্ষকে তিনি বলেন, অন্তত একজন অপরাধীকে প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়া হোক, কারণ তাদের কর্মকাণ্ড সৎ ব্যবসায়ীদের হয়রানি করছে। আমরা জানতে চাই, কারা বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করছে।বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) স্থানীয় স্পিনিং, উইভিং, ডাইং ও প্রিন্টিং মিল বিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, বর্তমানে বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের সমমূল্যের ফ্যাব্রিক ও পোশাকের চাহিদা রয়েছে, যার মধ্যে স্থানীয় মিলগুলো সরবরাহ করে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। বাকি ৫ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার সুতা, কাপড় বা পোশাক হয় বন্ড মিসইউজ, নয়তো চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে আসে।” যে কারণে অনেক স্থানীয় মিল এখন তীব্র আর্থিক সংকটে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, এনবিআরের এ উদ্যাগ অনিয়ম কমাতে সহায়ক হবে। তবে এর পরিপূর্ণ ফল পেতে হলে এনবিআরের সিস্টেম ও কর্মকর্তাদের দক্ষ হতে হবে।এদিকে, বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু সম্প্রতি এনবিআর অনুষ্ঠিত এক সভায় সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা অল্পকিছু অপব্যবহারকারীর জন্য পুরো ব্যবসায়ীসমাজ দায় নেব না।