কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে গড়ে উঠেছে লোকসংগীত ও সংস্কৃতিচর্চার অনন্য কেন্দ্র ‘মায়ের তরী’। এই সংগঠনের উদ্যোগে দুই জেলার প্রায় ৬০০ শিশু শিখছে লালনগীতি, মারফতি, মুর্শিদী, ভাওয়াইয়া ও পল্লীগানের মতো লোকগান। পাশাপাশি তারা শিখছে বাঁশি, দোতরা, একতারা, খমোক, সারিন্দা, তবলা, বেহালা ও বাংলাঢোলসহ নানান লোক বাদ্যযন্ত্র বাজানো। আধুনিক সংগীতের ঝলমলে দুনিয়ায় এমন উদ্যোগ ইতিমধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে সংস্কৃতি মহলে।রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের সিংহীমারী গ্রামের একটি টিনসেড ঘরে বসে প্রতি শুক্রবার ও শনিবার চলে শিশুদের গান শেখার ক্লাস। “সময় গেলে সাধন হবে না”—শিশুদের সমবেত কণ্ঠে গাওয়া সেই গানে মুখরিত হয় চারপাশ। কেউ গায়, কেউ বাজায় দোতরা, বাঁশি কিংবা মন্দিরা। হারমনিয়াম আর তবলার তালে তালিম দেন গুরু নারায়ণ চন্দ্র রায় ও তাঁর সহযোগীরা।গুরু নারায়ণ চন্দ্র রায় জানান, এখানে গ্রামের প্রান্তিক পরিবারের শিশুরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে লোকগান ও বাদ্যযন্ত্র শেখে। শহরে গানের স্কুলে যাওয়ার সুযোগ না পাওয়া এসব শিশুরাই এখন এই গুরুগৃহে নিয়মিত তালিম নিচ্ছে।‘মায়ের তরী’র পরিচালক সুজন কুমার বেদ বলেন, “নরওয়ের কবি, আলোকচিত্রী ও গবেষক উয়েরা সেথের বাংলা লোকসংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের সঙ্গে মিলে ২০১৬ সালে ‘মায়ের তরী’ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে আমাদের নয়টি গুরুগৃহে ৪৬০ শিশু লোকগান ও দুটি বাদ্যযন্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১২৫ শিশু বাদ্যযন্ত্র শেখছে।এছাড়া একটি বিশেষ ক্লাসে মাসে একদিন ১৫ জন শিশু লোকসংগীতের বিভিন্ন ধারা সম্পর্কে বিশেষ ধারণা নেয়।”‘মায়ের তরী’র অন্যতম সংগঠক ইউসুফ আলমগীর বলেন, “লোকসংগীত চর্চার মাধ্যমে শিশুদের আত্মশুদ্ধি ও জীবনের সৌন্দর্যবোধ জাগিয়ে তোলা—এই ভাবনা নিয়েই আমরা কাজ করছি। এখন গ্রামের এই গুরুগৃহগুলো হয়ে উঠেছে লোকগান চর্চার আতুরঘর।”প্রতিষ্ঠাতা উয়েরা সেথের বলেন, “বিশ্বে এখন যুদ্ধ আর প্রকৃতির বিপর্যয়ে মানুষ অস্থির। আমি বিশ্বাস করি, লালন, বাউল, মারফতি, মুর্শিদীর মতো লোকগান মানুষকে স্থিরতা ও মানবিকতার পথে ফিরিয়ে আনতে পারে।তাই বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এই সংগীতচর্চার মাধ্যমে আমরা মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলার চেষ্টা করছি।”নরওয়ের এই নাগরিক প্রথম বাংলাদেশে আসেন ১৯৯৮ সালে। কুড়িগ্রামের রৌমারীতে বন্যার পর মানুষের জীবনযাত্রা দেখতে গিয়ে তিনি স্থানীয় নারীদের মুখে মুর্শিদী ও মারফতি গান শুনে মুগ্ধ হন। সেই ভালোবাসা থেকেই পরবর্তীতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘মায়ের তরী’। এর পাশাপাশি তিনি ৫৩টি লালনগান নরওয়েজীয় ভাষায় অনুবাদ করে একটি বইও প্রকাশ করেছেন।
এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ..