বাংলাদেশে ২০-২৫ বছর আগেও স্কুলে গিয়েই শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন খেলাধুলায় মেতে উঠত। আবার স্কুল শেষে চলত নানান খেলা। এখন সেই সংস্কৃতি আর নেই। এটা যদি আবার চালু করা যায় তাহলে মাদক-সন্ত্রাসের হাত থেকে দেশ মুক্ত করা সম্ভব হবে। খেলাধুলায় শিশু-কিশোররা আগ্রহী হলে তারা মাদকে ঝুঁকবে না। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তা, বহুজাতিক কোম্পানি ও করপোরেটরা যুক্ত হলে বাংলাদেশ ক্রীড়াঙ্গনে অনেক দূর এগিয়ে যাবে। বিশ্বে যেসব দেশ ক্রীড়াঙ্গনে উন্নতি করেছে তারা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমেই খেলাধুলাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু এসব ভালো কাজের মধ্যেও বাংলাদেশের আকাশে দুর্যোগের কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপি সরকার গঠনের কয়েক দিনের মধ্যেই ইরান যুদ্ধ সরকারকে গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গত দেড় বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির অনেক ক্ষতি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েক লাখ মানুষ বেকার হয়েছে। মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজির কারণে বেসরকারি উদ্যোক্তারা অসহায় হয়ে পড়েছেন। দেশে নতুন বিনিয়োগ বন্ধ। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁদের হয়রানি করা হয়েছে। বিভিন্ন মনগড়া, ভিত্তিহীন অভিযোগের ভিত্তিতে বেসরকারি খাতের বিরুদ্ধে রীতিমতো রাষ্ট্রীয় হয়রানি করা হয়েছে। প্রকৃত অপরাধীদের আড়ালে রেখে স্বনামধন্য ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে কাল্পনিক দুর্নীতির অভিযোগ এনে মিডিয়া ট্রায়াল করা হয়েছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করে বেসরকারি খাতকে রীতিমতো গলা টিপে হত্যা করার চেষ্টা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম এজেন্ডা। গত দেড় বছর তাই দেশিবিদেশি বিনিয়োগ হয়নি। রপ্তানি আয় কমেছে। রেমিট্যান্স এবং ঋণের ওপর দেশ চলেছে। এ রকম একটি হতাশাজনক অবস্থা থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারকে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বেসরকারি খাতকে আস্থায় নিতে হবে। দ্রুত বেসরকারি খাতকে উজ্জীবিত করতে হবে। আর এটা করার জন্য সরকারকে এখনই কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে-
১. বন্ধ কলকারখানা দ্রুত চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে
২. ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যেসব মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে
৩. ঢালাওভাবে বন্ধ করা ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দিতে হবে
৪. দুর্নীতি তদন্তের নামে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে হয়রানি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে
৫. অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় দ্রুত বেসরকারি খাতকে আস্থায় নিয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কে কার সমর্থক, অতীতে কে কী বলেছে তা নিয়ে গবেষণা বাদ দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে
৬. আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। আর্থিক খাত সংস্কারের নামে গত দেড় বছর ব্যাংকিং খাতকে বিনিয়োগবিমুখ করে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে ব্যাংকিং খাতে জন আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে
৭. মব সন্ত্রাস কিছুটা কমলেও এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। মনে রাখতে হবে, মব সন্ত্রাস দেশের উন্নয়নের অন্যতম বড় বাধা। যেকোনো মূল্যে এ বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে জনগণকে মুক্তি দিতে হবে
৮. চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সরকারের শূন্য সহিষ্ণুতা নীতির বাস্তবায়ন করতে হবে।
গত এক মাসে সরকার এসব কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তারা এখন আর আশ্বাসে বিশ্বাসী নয়। মানুষ শান্তি চায়, নৈরাজ্য থেকে মুক্তি চায়।
বিএনপি সরকারের প্রথম এক মাসে কয়েকজন মন্ত্রীর অতিকথন রোগ জনমনে বিরক্তি সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষ অতীতের বাচাল মন্ত্রীদের ছায়া আর দেখতে চায় না। ‘পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে তোলা টাকাকে চাঁদাবাজি বলে মনে করি না’-এ রকম কথাবার্তার লাগাম টেনে ধরতে হবে এখনই।
প্রথম মাসে আমরা লক্ষ করেছি কথাবার্তায় সমন্বয়হীনতা। জ্বালানি তেলের সংকট নিয়েই একেক মন্ত্রী একেক রকম কথা বলছেন। এর ফলে একদিকে যেমন জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, তেমন সরকারের দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সরকারের একজন মুখপাত্র থাকা উচিত। যিনি বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরবেন। সবাই যেন সব বিষয়ে কথা না বলেন তা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে।
সরকারকে স্বচ্ছ হতে হবে। এ কারণেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। মূলধারার গণমাধ্যম যত স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবে, তত সমাজমাধ্যমের গুজব ও তথ্যসন্ত্রাস গুরুত্ব হারাবে। মুক্ত গণমাধ্যমই সরকারের সবচেয়ে আপন, এটা সরকারকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হবে। আর এ কারণেই সংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহারের জন্য জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। সংবাদমাধ্যমগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, নির্বাচন হয়েছে কিন্তু ষড়যন্ত্র শেষ হয়নি। নানানরকম ষড়যন্ত্র চলছে। সংসদে নানান ইস্যুতে বিরোধী দল সরকারকে চাপে রাখবে। কুড়ি বছর যারা বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রেখেছিল, তারা এখনো সক্রিয়। বৈশ্বিক পরিস্থিতি এখন প্রতিকূল। এ রকম অবস্থায় সরকারের সামনের পথ মসৃণ নয়। এ সরকারের জন্য কোনো হানিমুন পিরিয়ড নেই। কাজ দিয়েই এ সরকারকে তার যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। এ সরকারের সবচেয়ে বড় বন্ধু হলো জনগণ। জনগণের আস্থাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই শক্তি কাজে লাগাতে হলে জনগণের কাছে সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই সংকট মোকাবিলা করতে হবে।