পোর্তোতে মাতৃভাষা দিবস পালন ও ইন্টারকালচারালিটি অ্যাওয়ার্ডস-২০২৫ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ঐতিহ্যবাহী বাতাইলহা সিনেমা হল প্রাঙ্গণে এ বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ কমিউনিটি অব পোর্তো এবং ইসপাসো টি অ্যাসোসিয়েশন।
সন্ধ্যায় রুয়া চাঁ এলাকায় মাতৃভাষার শহীদদের স্মরণে পাবলিক মেমোরিয়ালে শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হয়। পরে রাত ১০টা নাগাদ মূল সাংস্কৃতিক ও পুরস্কার প্রদান পর্ব শুরু হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের চেতনা তুলে ধরা হয়। স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ কমিউনিটি অব পোর্তোর প্রেসিডেন্ট শাহ আলম কাজলসহ বক্তারা বলেন, মাতৃভাষা শুধু একটি জাতির পরিচয়ের প্রতীক নয়, বরং বহুসাংস্কৃতিক সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও অন্তর্ভুক্তির শক্ত ভিত্তি।
ইসপাসো টি দীর্ঘদিন ধরে পর্তুগালে তৃতীয় দেশের নাগরিক ও অভিবাসীদের নিয়ে শিল্প ও সংস্কৃতির মাধ্যমে আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ গড়ে তুলছে। এ কাজের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ কমিউনিটি অব পোর্তোর সঙ্গে গত সাত বছর ধরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করে আসছে তারা।
আয়োজকদের ভাষায়, “ভিন্নতাই শক্তি”—আর সেই দর্শন থেকেই পর্তুগালের বহুসাংস্কৃতিক সমাজকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্য তাদের।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ইসপাসো টির সভাপতি জর্জ অলিভেইরা, বাংলাদেশ কমিউনিটি অব পোর্তোর নেতা শাহ আলম কাজল, আব্দুল আলিম ও মোশাররফ হোসেন কিরণ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পর্তুগালে বাংলাদেশ দূতাবাস লিসবনের কনস্যুলার এস এম গোলাম সারওয়ার। তিনি ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল “ইন্টারকালচারাল অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫” প্রদান। মানবাধিকার, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, ক্রীড়া, সমাজসেবা, নগর উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তঃসাংস্কৃতিক মূল্যবোধ প্রচারে অবদান রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পান পুর্তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ। বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিকে শিক্ষার মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার স্বীকৃতিস্বরূপ এ সম্মাননা দেওয়া হয়। পুরস্কার গ্রহণ করেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক রুই কালসাদা।
ক্রীড়া ক্যাটাগরিতে সম্মাননা পায় পর্তুগালের অনূর্ধ্ব ১৭ জাতীয় ফুটবল দল, যারা বিশ্ব ও ইউরোপীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জাতীয় গৌরব বয়ে এনেছে।
মানবিক সহায়তা ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত হন টিমোটেও মাসেডো, অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ। সাংবাদিকতা ক্যাটাগরিতে সম্মাননা দেওয়া হয় মিডিয়াম আলভেস কে, অভিবাসীদের পরিবার পুনর্মিলনের জটিলতা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য।
সমাজসেবা ক্যাটাগরিতে সম্মাননা পান প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী পেড্রো আবরুনহুসা, যিনি তার শিল্প ও সামাজিক অবস্থানের মাধ্যমে বর্ণবাদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা রাখছেন।
সিটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত হয় ওয়েইরাস সিটি মিউনিসিপ্যাল, অভিবাসীবান্ধব নীতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর উন্নয়নের জন্য। পাবলিক পলিসি ক্যাটাগরিতে সম্মাননা পান পর্তুগিজ সংসদ সদস্য ইসাবেল মোরেইরা মানবাধিকার ও সমতার প্রশ্নে তার দৃঢ় অবস্থানের স্বীকৃতিস্বরূপ।
সবশেষে মেরিট ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত হয় প্রোগ্রাম ইসকলহাস যা ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিশু-কিশোরদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে পরিবেশিত হয় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, যা দর্শকদের বাংলাদেশে এক সাংস্কৃতিক ভ্রমণে নিয়ে যায়। মনমুগ্ধ করে আয়োজন শেষ হতে মধ্যরাত গড়িয়ে যায়।
আগত পর্তুগিজ অতিথিরা এ অনুষ্ঠানের অংশ হতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন এবং বাংলাদেশিদের ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন। অনুষ্ঠানে পর্তোতে বসবাসকারী বিভিন্ন স্তরের প্রবাসী বাংলাদেশীরা অংশগ্রহণ করেন।
প্রবাসের মাটিতে ভাষা শহীদদের স্মরণ এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এ আয়োজনকে অংশগ্রহণকারীরা “অনন্য ও অনুপ্রেরণাদায়ক” বলে অভিহিত করেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের চেতনাকে ধারণ করে পোর্তোতে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠান প্রমাণ করেছে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি মানবিক মর্যাদা, পরিচয় ও সহাবস্থানের শক্ত ভিত্তি।