সম্প্রতি খেলোয়াড়দের আয়ের উৎস নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ওয়ানডে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ জানান, দর্শকদের টাকায় খেলোয়াড়রা চলেন; এমন কথা শুনতে হলেও—বাস্তবতা ভিন্ন। ক্রিকেটারদের আয়ের প্রধান উৎস আইসিসি ও স্পন্সর। এতে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ভক্তদের মনে প্রশ্ন উঠেছে, আইসিসি কেন টাকা দেয়? কোথা থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পাচ্ছে এত টাকা? আর স্পন্সররাই বা কেন বিনিয়োগ করছে খেলাধুলায়? ক্রিকেটের পাশাপাশি একই প্রশ্ন উঠে ফুটবলের ক্ষেত্রেও।চলুন জেনে নেই খেলাধুলার অর্থনীতি। কিভাবে টাকা পায় আইসিসি বা ফিফা, আর কেনই বা বোর্ডকে দেওয়া হয় মোটা অঙ্কের টাকা—
বিশ্ব ক্রীড়া অঙ্গনে আইসিসি ও ফিফা আজ আর কেবল নিয়ম-কানুন নির্ধারণকারী কোনো সংস্থা নয়। এরা কার্যত ক্রিকেট ও ফুটবলের বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বকাপ কিংবা বড় টুর্নামেন্ট মানেই শুধু খেলা নয়, এর পেছনে আছে একটি পূর্ণাঙ্গ বিনোদন ও বিজ্ঞাপন শিল্প।আর এসবের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ থাকে এই নিয়ন্তা সংস্থাগুলোর হাতে।
আইসিসি ও ফিফার আয়ের প্রধান উৎস হলো টেলিভিশন ও ডিজিটাল সম্প্রচার স্বত্ব। একটি বিশ্বকাপ মানেই শত কোটি দর্শক। এই বিশাল দর্শকসংখ্যার কারণেই সম্প্রচার সংস্থাগুলো বিপুল অঙ্কের অর্থ দিতে রাজি হয়।উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফিফা বিশ্বকাপ ২০২২ থেকে ফিফার মোট আয় ছিল প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার, যার প্রায় অর্ধেকের বেশি এসেছে সম্প্রচার স্বত্ব থেকে। আইসিসির ক্ষেত্রেও ২০২৪-২৭ চক্রে শুধুমাত্র মিডিয়া রাইটস থেকেই আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে কয়েক বিলিয়ন ডলার।
স্পন্সরশিপ আইসিসি ও ফিফার দ্বিতীয় বৃহৎ আয়ের খাত। কোকা-কোলা, অ্যাডিডাস, নাইকি, এমিরেটসের মতো বিশ্ববিখ্যাত সব কম্পানি ফিফা বা আইসিসির বৈশ্বিক টুর্নামেন্টগুলোকে স্পন্সর করে কারণ এখানে পৃথিবীর বিলিয়নের বেশি দর্শকদের একই সঙ্গে পাওয়া যায়। যাতে কম্পানিগুলো একটি ইভেন্টেই একসঙ্গে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার বাজারে পৌঁছে যেতে পারে।একটি অফিসিয়াল স্পন্সর চুক্তির মূল্য অনেক ক্ষেত্রে শত শত মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। বাস্তবে এটি বিজ্ঞাপন নয়, বরং বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডিং বিনিয়োগ। যার কেন্দ্রে ক্রীড়াভক্ত দর্শকরাই।
স্টেডিয়ামে সরাসরি দর্শক উপস্থিতিও বড় আয়ের উৎস। ফিফা বিশ্বকাপে শুধু টিকিট বিক্রি থেকেই শত কোটি ডলার আয় করে। এর সঙ্গে যোগ হয় অফিসিয়াল জার্সি, বল, ক্যাপসহ বিভিন্ন স্মারক পণ্য। পাশাপাশি ফিফা বা আইসিসির ভিডিও গেম ও লাইসেন্সিং চুক্তি থেকেও নিয়মিত রাজস্ব আসে।
খেলোয়াড়দের বেতন দেয় কে?
একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো—সরকার জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বেতন দেয়। বাস্তবে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বেতন দেয় তাদের নিজ নিজ দেশের ক্রিকেট বোর্ড বা ফুটবল ফেডারেশন। এসব বোর্ড অর্থ পায় আইসিসি বা ফিফার রাজস্ব বণ্টন, স্থানীয় স্পন্সর ও সম্প্রচার চুক্তি থেকে।
বিসিসিআই আইসিসি থেকে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব পায়। কারণ তাদের দর্শকসংখ্যা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি। আর দর্শক বেশি হওয়ায় আইসিসির বেশির ভাগ আয় আসেও ভারত থেকে। ২০২৪-২৭ চক্রে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির মোট আয়ের ৩৮.৬ শতাংশই পেয়েছে ভারত। একই সময়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬.৮৯ শতাংশ পেয়েছে ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি)। আর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ) পেয়েছে ৬.২৫ শতাংশ, যা ভারতের চেয়ে ছয় গুণেরও কম। প্রথম থেকে তৃতীয় স্থানের পার্থক্যই তুলে ধরে খেলার আয়ে দর্শকদের ভূমিকা।
একইভাবে, বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল সম্প্রতি জানিয়েছেন, বিসিবি প্রতি বছর মোট রাজস্বের প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ পেয়ে থাকে আইসিসি থেকে।
ক্লাব ফুটবল ও ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে টাকা আসে কোথা থেকে?
ক্লাব ফুটবলে খেলোয়াড়দের বেতন দেয় ক্লাব মালিকরা। তাদের আয়ের উৎস লিগের সম্প্রচার স্বত্ব, স্পন্সর, টিকিট বিক্রি ও বাণিজ্যিক চুক্তি। একইভাবে আইপিএল, বিপিএল বা বিগ ব্যাশের মতো লিগে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক দেয় ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকরা, যারা বিনিয়োগ তুলে আনে বিজ্ঞাপন ও টিভি স্বত্ব থেকে।দর্শক চাহিদার কারণেই, বিপিএল, পিএসএলসহ বিশ্বের অন্যান্য ক্রিকেট লিগ থেকে আইপিএল আয়ের ক্ষেত্রে এত এগিয়ে।
ফুটবলেও দেখা যায় একই চিত্র। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দর্শক চাহিদার জন্যই ফরাসি লিগ আঁ, জার্মান বুন্ডেসলিগা বা ইতালির সেরি আ থেকে অনেক বেশি আয় করে স্প্যানিশ লা লিগা ও ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ।
দর্শকদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
খেলাধুলার এই পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন দর্শকরা। দর্শক না থাকলে সম্প্রচার স্বত্বের দাম বাড়ে না, স্পন্সর আসে না, স্টেডিয়াম ভরে না। আর এই চক্রের মধ্য দিয়েই দর্শকের পকেট থেকেই টাকা যায় আইসিসি বা ফিফার কাছে। আর পণ্যের সঙ্গে বিজ্ঞাপন ব্যয় যোগ করেই দাম নির্ধারণ করায় স্পন্সরদের বিনিয়োগের টাকাও যাচ্ছে আসলে দর্শকদের কাছ থেকেই।
তাই একজন দর্শক যখন টিভিতে ম্যাচ দেখেন, টিকিট কাটেন বা জার্সি কেনেন—তখন তিনি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই বৈশ্বিক ক্রীড়া অর্থনীতিকে চালু রাখেন। আর সেখান থেকেই বেতন হয় খেলোয়াড় থেকে খেলার সঙ্গে যুক্ত সবার।