বাংলাদেশের রাজনীতি সংগত কারণেই এখন নির্বাচনমুখী। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় রাজনৈতিক দলগুলোর বড় ভূমিকা আছে। তাদের এক ধরনের গণভিত্তি ও অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু তাদের বড় দুর্বলতা হলো, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী খেলার যে নিয়মাবলি, সেগুলো নিয়ে এক জায়গায় আসতে পারেনি। তা ছাড়া নির্বাচনকালীন যে নিরপেক্ষ রেফারি প্রয়োজন, তার সমাধান করতে গিয়েও সংকট তৈরি হয়েছে। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির মাধ্যমে এর একটা সমাধান হয়েছিল বটে, কিন্তু এক দশক পরই তা নিয়ে আবার সমস্যা তৈরি হলো। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেই এক ধরনের অপকৌশলের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে। মাঝে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।
অবশেষে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে তাদের থেকে মুক্তির পাশাপাশি আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে এসেছে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে অন্তর্বর্তী সরকার এসেছে, তাদের অন্যতম দায়িত্ব নিঃসন্দেহে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণ। ইতোমধ্যে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুসারে শিগিগরই হয়তো তপশিল ঘোষণা করা হবে। নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনও শেষ হবে। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর এ সরকার যে বিশাল জনপ্রত্যাশা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, তা পর্যালোচনার দাবি রাখে। মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল, যা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। দৃশ্যমান দুর্নীতি কিছুটা কমলেও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রয়ে গেছে। কারণ যারা দুর্নীতি করে তারা বুঝে গেছে, কেউ তাদের বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারবে না।
অন্তর্বর্তী সরকার কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বটে, সেখানে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হলে হয়তো তারা আরও ভালো কিছু উপহার দিতে পারত। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো বৃহত্তর চিন্তার চেয়ে কিছু সংকীর্ণ স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে না। পরিবর্তনের কাজটা অবশ্য এককভাবে রাজনৈতিক দলগুলো করে না। এখানে সামাজিক শক্তি ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও আছে। এখানে সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশকে নিতে না পারার ব্যর্থতা আছে। অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনের মতো ব্যাপক রাজনৈতিক পুঁজি নিয়ে চলা শুরু করেছিল। অথচ সরকার এই রাজনৈতিক পুঁজির সদ্ব্যবহার করতে পারেনি। দিন শেষে তার অপচয়ই হলো, বলা চলে।
অন্তর্বর্তী সরকার যে সংস্কার আলোচনা শুরু করেছিল, সেখানে সিরিয়াসনেসের একটা ঘাটতি আমরা দেখেছি। সিদ্ধান্তহীনতাও পরিলক্ষিত হয়েছে। আমলাতন্ত্রের প্রয়োজন আছে, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক শাসন নয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের ইতিহাস যখন আমরা বিশ্লেষণ করব তখন আমলাতান্ত্রিক শাসনের বাস্তবতাই দেখা যাবে। একই সঙ্গে সিদ্ধান্তহীনতার কারণে, টিমওয়ার্কের অভাবে কাজ শেষ না করে নিছক সংস্কার শব্দটাই চালু হয়েছে বলা যায়; অর্জনের ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে দূর হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল মানুষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার একটা প্রক্রিয়া অনুসরণ ও সে আবহ তৈরি করা। সফল গণতান্ত্রিক সমাজে এটি খুব জরুরি। কিন্তু মানুষ দেখেছে, যে ঐক্য সংহত হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। অর্থনীতিও সেই ক্ষমতায় পৌঁছেনি। এ সরকারের সময়ে সার্বিক একটা অনিশ্চয়তার ভাব লক্ষণীয়। নির্বাচন নিয়েও এক ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল। সেটা অবশ্য কাটিয়ে উঠেছে। কিন্তু অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। বিনিয়োগকারীরা এখনও আস্থা পায়নি। অনিশ্চয়তার এই আবহের সমাপ্তি জরুরি। এমনকি আইনশৃঙ্খলা যারা সামাল দিচ্ছেন, সেখানেও একই কথা প্রযোজ্য।
নির্বাচনের মাধ্যমে হয়তো একটা দিকের অনিশ্চয়তা কাটতে পারে। সবাই চায়, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে অনিশ্চয়তার একটা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ কাটবে। এটা একটা দিক। আরেকটা হলো নির্বাচনের জন্য প্রতিশ্রুতি হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলো অনেক কিছুই বলছে। আমরা তাদের ওপর ঠিক অতটুকুই আস্থা রাখব যতটুকর প্রমাণ তারা দেখাতে পারবে। কতটুকু তারা কী বাস্তবায়ন করবে। নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার পরও জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং সে জন্য চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো যেন জনগণকে বোকা না ভেবে তাদের মধ্যে আস্থা তৈরির কাজ করে।
নাগরিক সক্রিয়তাও অব্যাহত থাকা দরকার। নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী, তৃণমূলের মানুষ, ব্যবসায়ী– সবারই সক্রিয়তা দরকার। এমন নয় যে, নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছে যাব। আমরা যদি পেছনে ফিরি, ১৯৯১ থেকে এক দশকে অর্থনীতির ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। প্রাইভেট ব্যাংকিং থেকে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির বিস্তার যেমন আমরা দেখেছি, তেমনি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও সামাজিক নিরাপত্তার ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। তবে আস্থা রাখতে হবে দেশের মানুষের ওপর। আমরা সজাগ থাকব, সক্রিয় থাকব এবং দেশকে ঠিক করার সামগ্রিক দায়িত্বের অংশীদার হিসেবে আমাদের জাগ্রত থাকতে হবে। ঐকমত্য কমিশনে আলোচনার ক্ষেত্রে দুঃখজনক যে বিষয়টি আমার মনে হয়েছে তা হলো, তারা মানুষ কী ভাবছে, সেদিকে খুব একটা নজর দেয়নি।
বাংলাদেশ বড় ধরনের একটা শিক্ষা পেয়েছে– ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। যত শক্তিশালী হোক, যত কাঠামোগত ভিত্তিই থাকুক কিংবা বিদেশি শক্তির ভরসা থাকুক, তারপরও থেমে যেতে হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন যে জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হবেন, তাদের যেন আমরা ‘এমপিরাজ’ না বানাই। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে। ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিটি স্তরে প্রয়োজন। রাজনৈতিক পুঁজির অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। এখানে কেবল রাজনীতিবিদদের ঠিক হলেই হবে না কিংবা কেবল আমলাতন্ত্র ঠিক করলেই হবে না। এখানে প্রত্যেকেরই দায়িত্ব আছে। এটা একটা চলমান যুদ্ধ।
সমাজ চব্বিশের অভ্যুত্থানে একটা ট্রমার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। ট্রমা থেকে সমাজকে উদ্ধার করতে সহমর্মিতার হাত বাড়াতে হয়। কথা বলতে হয়। কাউন্সেলিং তথা হিলিং। হিলিং মানে এটা নয়– মানুষ প্রত্যাশা করছে, রাষ্ট্র তাকে এক লাখ টাকা দিক। এটি হলো, কারও প্রতি যাতে অনৈতিক আচরণ না হয়। নির্বাচন শেষ হয়ে গেলেও এই হিলিংয়ের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে হবে। শুধু ঢাকা শহরে নয়, তৃণমূল পর্যায়ে যারা আছেন, তাদেরও এ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।