বই মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু। জ্ঞান অর্জনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যমও বই। যুগের পর যুগ ধরে মানুষ বইয়ের মাধ্যমে জ্ঞান, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ অর্জন করে নিজেকে আলোকিত করেছে। আর এই বইগুলোকে পাঠকের নাগালের মধ্যে পৌঁছে দিতে এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে পাঠাভ্যাসে উৎসাহিত করতে যে প্রতিষ্ঠানটি নিরলস কাজ করে যাচ্ছে, সেটি হলো গ্রন্থাগার। উত্তরা অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য এমন এক জ্ঞানের বাতিঘর হয়ে উঠেছে উত্তরা পাবলিক লাইব্রেরি, যা বইপ্রেমীদের জন্য যেন এক অভয়াশ্রম।
উত্তরা পাবলিক লাইব্রেরির যাত্রা শুরু হয় ২০১৮ সালের ১লা জানুয়ারি। এটি উত্তরা ১০ নাম্বার সেক্টরের ১ নাম্বার রোডের ৪ নাম্বার বাসায় অবস্থিত। এই পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা হলেন—মোহাম্মদ তারেকউজ্জামান খান। উত্তরা পাবলিক লাইব্রেরি শুধু একটি লাইব্রেরি নয়,…
[3:23 pm, 23/09/2025] +880 1341-918189: ইট-পাথরের নগরে আলো ছড়াচ্ছে ‘উত্তরা পাবলিক লাইব্রেরি’
নিজস্ব প্রতিবেদক
নির্জন দুপুর কিংবা ব্যস্ত বিকেল—উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের ১ নাম্বার রোডে এক নিরিবিলি জায়গায় অবস্থিত একটি প্রতিষ্ঠান দিনের পর দিন ছড়িয়ে দিচ্ছে জ্ঞানের আলো, আর বইয়ের মায়াময় সুবাসে মাতিয়ে রাখছে পাঠকদের মন। এটি উত্তরা পাবলিক লাইব্রেরি—উত্তরাবাসীর গর্ব, বইপ্রেমীদের আশ্রয়স্থল। প্রযুক্তি ও যান্ত্রিক জীবনের ভিড়ে মানুষের মানসিক প্রশান্তি ও আত্মিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন হয় জ্ঞানের। সেই জ্ঞানের উৎসস্থলই হলো লাইব্রেরি, যেখানে বই কেবল পড়ার জিনিস নয়, বরং সমাজ গঠনের শক্তিশালী হাতিয়ার।
উত্তরা পাবলিক লাইব্রেরি ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি “সৃজনশীল মানুষ গড়ার প্রত্যয়ে” যাত্রা শুরু করে। শুরু থেকেই লাইব্রেরিটি হয়ে উঠেছে উত্তরার জ্ঞানপিপাসু মানুষের নির্ভরযোগ্য একটি জায়গা। গ্রন্থাগারের ইতিহাস যেমন সুপ্রাচীন, তেমনি তার গুরুত্ব আজও অপরিসীম। প্রাচীন ব্যাবিলন, মিশর, ভারত, চীন কিংবা তিব্বতের সভ্যতাতেও গ্রন্থাগার ছিল জ্ঞান সংরক্ষণের কেন্দ্র। এমনকি রোমে সর্বসাধারণের জন্য খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে লাইব্রেরি স্থাপিত হয়। মুসলিম শাসনামলে স্পেন, বাগদাদ, কায়রোতে বিশাল গ্রন্থাগার স্থাপিত হয়েছিল, যা বিশ্ব সভ্যতার জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছিল। সেই ঐতিহ্যেরই অংশ আজকের উত্তরা পাবলিক লাইব্রেরি।
লাইব্রেরিটি একটি সম্পূর্ণ বেসরকারি, অরাজনৈতিক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ তারেকউজ্জামান খান এই পাঠাগার নির্মাণের পেছনে নিবেদিতপ্রাণ একজন সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ, যিনি আত্মবিশ্বাস ও দূরদর্শিতায় এই মহান উদ্যোগটি গ্রহণ করেন। বর্তমানে লাইব্রেরিতে রয়েছে প্রায় বিশ হাজার বই। সাহিত্যের থেকে শুরু করে ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, আত্মউন্নয়ন, জীবনী, গবেষণা ও শিশুতোষ গ্রন্থসহ নানান বিষয়ে সমৃদ্ধ এই সংগ্রহশালা। প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন পাঠক এই লাইব্রেরিতে আসেন এবং তাঁদের জন্য রয়েছে ৫০টি আসন।
লাইব্রেরির পরিবেশ পড়াশোনার জন্য একেবারে উপযুক্ত। প্রতিটি কক্ষে সিসি ক্যামেরা দ্বারা সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হয়, রয়েছে আইপিএস সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এটি খোলা থাকে, যাতে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী কিংবা অবসরপ্রাপ্ত যে কেউ সুবিধামতো সময় এসে বই পড়তে পারেন। এখানকার পরিবেশ শুধু নিরিবিলি নয়, বরং জ্ঞানের আবহে পরিপূর্ণ।
এই লাইব্রেরিকে কেন্দ্র করে উত্তরায় বইপড়ার একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষক থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত জ্ঞানানুরাগীরাও নিয়মিত পাঠক হিসেবে এখানে আসেন।
উত্তরা পাবলিক লাইব্রেরির মূল লক্ষ্য হচ্ছে সর্বস্তরের পাঠকদের পাঠসেবা প্রদান, অর্জিত শিক্ষার সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ, সামাজিক চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানো এবং অপসংস্কৃতির বিপরীতে সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করা। এছাড়াও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাকে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং দেশের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতিতে অবদান রাখাই এই লাইব্রেরির মিশন।
লাইব্রেরির ভিশন হলো—শিক্ষা ও জ্ঞানের পরিপূর্ণ বিকাশের লক্ষ্যে একটি উদার ও প্রগতিশীল পাঠাগার গড়ে তোলা, যেখানে জ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং সংস্কৃতি মিলেমিশে তৈরি হবে একটি জ্ঞাননির্ভর সমাজ। পাঠাগারের প্রত্যেকটি বই যেন একজন মানুষের চিন্তা, অনুভব ও চেতনার পথ দেখায়। এখানকার প্রত্যেক পাঠক হয়ে উঠুক একটি আলোকিত ভবিষ্যতের দূত।
এই পাঠাগার শুধু একটি ভবন নয়—এটি একটি চিন্তার কেন্দ্র, সংস্কৃতির কেন্দ্র, স্বপ্নের কেন্দ্র। এখান থেকে যাত্রা শুরু করে অনেকেই জীবনে সফল হয়েছে, নতুন পথ পেয়েছে, নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করেছে। লাইব্রেরির কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে আরও আধুনিকতা আনার পরিকল্পনা করছে। যেমন—ডিজিটাল লাইব্রেরি, অনলাইন বুক রিজার্ভেশন, শিশু পাঠকোণ, সাপ্তাহিক পাঠচক্র, লেখালেখির কর্মশালা এবং সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজনের মতো কার্যক্রম।
লাইব্রেরিটি বর্তমান সময়েও শুধুমাত্র পাঠচর্চায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রতি বছর এখানে গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান, সেরা শিক্ষার্থী সংবর্ধনা, মুক্তিযোদ্ধা ও হাফেজে কোরআনের সম্মাননা, রত্নগর্ভা মা ও গর্বিত বাবার স্বীকৃতি, সেরা শিক্ষক ও খ্যাতিমান সাহিত্যিকদের সংবর্ধনার মতো মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এসব আয়োজন শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করে এবং সমাজে মূল্যবোধ, শ্রদ্ধাবোধ ও মানবিকতার বিকাশে সহায়তা করে যাচ্ছে।
উত্তরা পাবলিক লাইব্রেরি এখন শুধু উত্তরাবাসীর নয়, বরং ঢাকা শহরের গর্ব। এটি একটি আলোকবর্তিকা, যা অন্ধকার সমাজে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। মানুষের মননের বিকাশে, চিন্তার গভীরতায় এবং মূল্যবোধের জাগরণে এই লাইব্রেরির অবদান নিঃসন্দেহে অসামান্য। গ্রন্থাগার সম্পর্কে একটি প্রাচীন উক্তি রয়েছে“লাইব্রেরি হলো এমন এক স্থান, যেখানে মানবসভ্যতার চেতনার ইতিহাস সংরক্ষিত থাকে।” উত্তরা পাবলিক লাইব্রেরি সেই দায়িত্ব শ্রদ্ধাভরে পালন করে চলেছে—আজ, আগামীকাল এবং ভবিষ্যতের জন্য।