প্রেম মানুষের সহজাত। প্রেমে আনন্দ যেমন আছে, বিশ্বাস যেমন আছে, তেমনি আছে বিশ্বাসঘাতকতা। এত কিছুর পরও প্রেম ছাড়া জীবন অর্থহীন। সেটি নিষ্কাম প্রেমও হতে পারে। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, তা দূরেও ঠেলে দেয়।’গত ১৬ নভেম্বর, চমৎকার এক সন্ধ্যায় বাংলাদেশ মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হলো ‘প্রেম প্রলোভন দ্বন্দ্ব’। ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মাকার চুদ্রা’, আলেকজান্ডার পুশকিনের ‘স্টেশনমাস্টার’ এবং হেনরিক ইবসেনের ‘এ ডলস হাউস’ এ তিন কাহিনি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এ নাটক। এর দ্বন্দ্ব, সংঘাত, প্রলোভন, বিশ্বাসঘাতকতা, নির্মমতা বর্তমান সময়েও আমাদের কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ভালোবেসে সবকিছু ত্যাগ করে যে প্রেমিক প্রেমিকার হাত ধরে; এক সময়ে সেই বিশ্বাসের হাত সংহার মূর্তি ধারণ করে সব তছনছ করে দেয়। এই কি প্রেম? না প্রেমের আড়ালে প্রলোভন, দ্বন্দ্ব? নোরা ভালোবেসে স্বামীর প্রাণরক্ষায় গোপনে ঋণ নেয়, রাত জেগে পয়সা জমায়। পরে উপলব্ধি হয়, সে প্রেম ছিল মুখোশ। স্টেশনমাস্টারের সরল কন্যা দুনিয়াশা। যে তাঁর সরলতা দিয়ে পৃথিবীটাকে দেখেছে। প্রাণ দিয়ে সেনা অফিসার মিনিস্কিকে ভালোবেশেছে। প্রেমে মোহগ্রস্ত হয়ে পিতাকে অস্বীকার করেছে। পরে উপলব্ধি করেছে, সেটি প্রেম ছিল না; ছিল ভয়ংকর প্রলোভন। তরুণ উদীয়মান নাট্যকার, নির্মাতা ও নির্দেশক তানভীর নাহিদ খান অসাধারণ দক্ষতায় তাঁর অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভিনয় গুণে দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলেন। রাডা, নোরা, দুনিয়াশা চরিত্রে রূপদানকারী আদিবা, নন্দিনী, রাইসা অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করেছেন। জোবার, মিনিস্কি, হেলমার, মাকার চুদ্রা, নোংকা, ভিরিন এসব চরিত্রে– তানভীর, তানজিম, ইমরান, আফরিদা, মিনহাজ তাদের অভিনয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। অন্যরা তাদের চরিত্রে ছিলেন যথাযথ। অভিনেতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নির্দেশক তানভীর নাহিদ ছিলেন যথার্থ।মঞ্চ ও আলোক প্রক্ষেপণ, পোশাক, আবহসংগীত, কোরিওগ্রাফি সবই দর্শকদের মুগ্ধ। ম্যাক্সিম গোর্কি, আলেকজান্ডার পুশকিন ও হেনরিক ইবসেনের তিনটি ভিন্নধর্মী রচনা থেকে বোনা এই নাটক প্রেম, প্রলোভন ও আত্মমর্যাদার বহুমাত্রিক সংগ্রামকে নতুন করে অনুভব করায়। গোর্কির ‘মাকার চুদ্রা’, পুশকিনের ‘দি স্টেশনমাস্টার’ এবং ইবসেনের ‘এ ডলস হাউস’– এই তিনটি গল্পের তিন নারী চরিত্র নোরা, দুনিয়াশা ও রাডাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে নাটকের আবেগঘন বুনন। প্রতিটি চরিত্র নিজ নিজ গভীরতায় বিকশিত হয়েছে, আর নির্দেশক অত্যন্ত নিপুণভাবে তাদের অভ্যন্তরীণ উত্তাপকে মঞ্চে দৃশ্যমান করেছেন। অভিনেতা অভিনেত্রীগণ স্পষ্টভাবে সংলাপ বলেছেন, চমৎকার ও সাবলীলভাবে অভিনয় করেছেন।নোরার নীরব অথচ প্রবল সংগ্রাম– স্বামীর জীবন বাঁচাতে গোপনে ঋণ নেওয়া এবং পরে স্বামীর প্রেমের আসল রূপ চিনে ফেলার মুহূর্ত দর্শকের হৃদয়ে নাড়া দেয়। দুনিয়াশার বিলাসিতার লোভে বাবাকে ত্যাগ করে পরবর্তীকালে অনুতাপে ভেঙে অতীত প্রলোভনের নিস্তরঙ্গ সত্যকে সামনে আনে।অন্যদিকে রাডার দৃঢ়, অনমনীয় সিদ্ধান্ত, যা কিনা সমর্পণের চেয়ে মর্যাদাকে বেছে নেয়। ফলে তাঁর করুণ পরিণতিতে গভীর প্রতীকী শক্তি তৈরি করেছে। তবে স্টেশনমাস্টার গল্পের পটভূমি আরও কিছুটা বিস্তৃত হতে পারত। বয়সে তরুণ হলেও থিয়েটার স্কুলের ৩৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থীগণের অভিনয় ছিল উল্লেখযোগ্য। তাদের সংবেদনশীল অভিনয়, মঞ্চে শরীরী ভাষা ব্যবহারের দক্ষতা এবং চরিত্রে সম্পৃক্ততা প্রযোজনাটিকে এক অন্য মাত্রায় তুলে ধরেছে। তিনটি ভিন্ন গল্প হলেও নাট্যের বিন্যাস ও বুননে চমৎকার ঐক্য ছিল। তা ছাড়া আলোকসজ্জা, আবহ সংগীত এবং কোরিওগ্রাফি উপভোগ্য ছিল। সব মিলিয়ে ‘প্রেম প্রলোভন দ্বন্দ্ব’ ছিল এক নান্দনিক অভিজ্ঞতা।এটি কেবল তিন নারীর গল্প নয়, এটি মানুষের সিদ্ধান্ত, আকাঙ্ক্ষা এবং আত্মসম্মানের ছায়াচিত্র। নাটকটি শেষে দর্শকের মনে যে তীব্র প্রশ্নগুলো রয়ে যায়, সেগুলোই তার সাফল্যের প্রমাণ। ‘প্রেম প্রলোভন দ্বন্দ্ব’ একটি চিন্তাশীল এবং মনকে আলোড়িত করা নাটক। এ ধরনের নাটক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ভালো থিয়েটার সবসময়ই জীবনের প্রতিচ্ছবি।