ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার বলেছেন, “এই মুহূর্তে ব্যাংকিং খাতের প্রধান সংকট তারল্য নয়, বরং উচ্চ খেলাপি ঋণ, যা এক ধরনের ‘ক্যান্সারের মতো’ ভিতর থেকে খাতটিকে ক্ষয় করছে। সামগ্রিকভাবে শিল্পে তারল্যসংকট খুব বেশি নেই, তবে কিছু কিছু ব্যাংকে সমস্যা রয়েছে। কিন্তু বড় সমস্যা হচ্ছে খেলাপি ঋণ, যা সামগ্রিক অর্থনীতি, ব্যাংকের লাভ এবং শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশে বড় প্রভাব ফেলছে।”
বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি বলেন, ‘বাইরে থেকে দেখা যায় ব্যাংকের আয় ভালো, লাভ ভালো।কিন্তু ভেতরে ভেতরে খেলাপি ঋণ ব্যাংককে ক্ষয় করছে। এর কারণে প্রভিশন করতে হচ্ছে, লভ্যাংশ দেওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে খেলাপির হার এখনো অত্যন্ত বেশি। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তবুও এটি আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক বেশি।
ইস্টার্ন ব্যাংকের সাফল্যের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গত ৩০ বছরে তাদের গড় খেলাপি ঋণ প্রায় ৩ শতাংশ। এ সফলতার পেছনে রয়েছে চারটি কৌশল : সঠিক গ্রাহক নির্বাচন, ঋণ প্রস্তাবের সঠিক মূল্যায়ন, ঋণ বিতরণের পর নিয়মিত মনিটরিং এবং শক্তিশালী আদায় ব্যবস্থা।’আলী রেজা ইফতেখার বলেন, ‘ঋণ দেওয়ার পর মনিটরিং না করলে ভালো গ্রাহকও খারাপ হয়ে যেতে পারে।’ বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে কেওয়াইসি প্রক্রিয়া আরো কঠোর হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখন যেভাবে-সেভাবে টাকা এনে ব্যাংকে জমা রাখা যায় না।
আমরা গ্রাহকের আয়ের উৎস যাচাই করি, ট্রানজাকশন প্রোফাইল বিশ্লেষণ করি।’ বিদেশি ব্যাংকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইফতেখার বলেন, বোর্ডের কাজ হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণ, সরাসরি ঋণ অনুমোদন নয়। ‘বোর্ড পলিসি নির্ধারণ করবে, আর পেশাদার ম্যানেজমেন্ট সেই পলিসির ভিত্তিতে ঋণ অনুমোদন দেবে, এটাই সবচেয়ে কার্যকর মডেল।’তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে জমির মূল্য প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দেখানো হয়, যা ঋণের ঝুঁকি বাড়ায়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।ডলারের আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসায়ীদের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। আগে যদি ধীরে ধীরে ডলারের দাম সমন্বয় করা হতো, তাহলে এত বড় ধাক্কা আসত না। এখন আমদানি খরচ বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে।
২০২৬ সালকে চ্যালেঞ্জিং বছর হিসেবে উল্লেখ করে আলী রেজা ইফতেখার বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থনীতি স্থিতিশীল হতে সময় লাগে। এলডিসি থেকে উত্তরণ বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের সেই লক্ষ্যে যেতে হবে, তবে হয়তো আরও কিছু সময় নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। নতুন প্রজন্মের ব্যাংকারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শুধু স্মার্ট চিন্তা নয়, হার্ডওয়ার্কও করতে হবে। শর্টকাটে সফল হওয়া যায় না। নেতৃত্ব দিতে হলে ধৈর্য, দক্ষতা এবং পরিশ্রম- সবই প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আমাদের ব্যাংকে সিনিয়র পজিশনে কাজ করে অন্য ব্যাংকের এমডি হয়েছে অনেকেই। আবার অবসর গ্রহণ করেছেন ১৩ জনের মতো। আমরা সবাই কিন্তু এটা গর্ব করি ইস্টার্ন ব্যাংকের প্রচুর ছেলেমেয়ে কিন্তু এখন বিভিন্ন ব্যাংকের এমডি। আমরা এরকম যোগ্য ব্যাংকার তৈরি করতে পেরেছি, যারা আজকে ব্যাংকিং খাতকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা আমাদের থেকেও ভালো করছে এটাই আমাদের সফলতা।
২০০৭ সাল থেকে এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আলী রেজা ইফতেখার জানান, তার যোগদানের সময় ব্যাংকের মুনাফা ছিল মাত্র ৪২ কোটি টাকা, যা বর্তমানে ৯০০ কোটি টাকার বেশি। আমানত ছিল ৩ হাজার কোটি টাকা, বর্তমানে ৫৭ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ঋণ ছিল ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এখন ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ইস্টার্ন ব্যাংকের আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ ৭২০ কোটি ডলার।
তিনি বলেন, এ সাফল্য শুধু আমার নয় বোর্ড, ম্যানেজমেন্ট এবং কর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। আলী রেজা ইফতেখারের মতে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ করা। সঠিক নীতি, শক্তিশালী মনিটরিং এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
আলী রেজা ইফতেখার ১৯ বছরের বেশি সময় ধরে বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষ ব্যাংক ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিংয়ে এই গ্র্যাজুয়েট ঝুঁঁকি ব্যবস্থাপনা ও করপোরেট কমপ্লায়েন্সে বিশেষজ্ঞ। তিনি ‘সিইও অব দ্য ইয়ার ২০১২’ পুরস্কার অর্জন করেছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন বেসরকারি ব্যাংক এমডিদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের।
এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ..