হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, জটলা, বিলম্ব ও মালামাল চুরির অভিযোগ ঠেকাতে এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। বিমান থেকে লাগেজ নামানো শুরু করে নির্দিষ্ট বেল্ট বা গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো গতিপথ লাইভ পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে বিমানবন্দরের ব্যাগেজ এলাকায় বসানো হচ্ছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি বিশেষ এআই ক্যামেরা। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে লাগেজের গতিবিধি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুসরণ করা হবে। কোনো লাগেজ নির্ধারিত পথের বাইরে গেলে কিংবা অস্বাভাবিক সময় কোনো স্থানে পড়ে থাকলে সঙ্গে সঙ্গে সংকেত দেবে সিস্টেম। শুধু বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ নয়, প্রয়োজনীয় সংযোগের মাধ্যমে সচিবালয় থেকেও দেখা যাবে লাগেজ ব্যবস্থাপনার লাইভ ফুটেজ। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এ লক্ষ্যে প্রাথমিক কাজও শুরু করেছে।
বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার অন্যতম বড় ভোগান্তির নাম লাগেজ। উড়োজাহাজ থেকে নামানোর পর লাগেজ বেল্টে আসতে দীর্ঘ সময় লাগা, একসঙ্গে বিপুল লাগেজ জমে জট তৈরি হওয়া, লাগেজের অবস্থান সম্পর্কে যাত্রীদের সঠিক তথ্য না পাওয়া এবং মালামাল হারানো বা চুরির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক সময় কোন পর্যায়ে লাগেজ আটকে আছে, সেটিও তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা যায় না। ফলে যাত্রীকে হয়রানির পাশাপাশি পুরো ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনায় তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা। নতুন এআই ক্যামেরা নেটওয়ার্কে এসব সমস্যার দৃশ্যমান ও তাৎক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিমানবন্দরের ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং এলাকায় ২৫ থেকে ৩০টি এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। ইনডোর ও আউটডোর এলাকার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন ধরনের
ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় একটি ক্যামেরার আওতা শেষ হওয়ার পর পরবর্তী ক্যামেরা একই লাগেজের গতিপথ অনুসরণ করবে। ফলে বিমান থেকে লাগেজ নামানোর পর সেটি কোন পথে যাচ্ছে, কোথায় নেওয়া হচ্ছে এবং নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে কত সময় লাগছে— তার একটি ধারাবাহিক চিত্র পাওয়া যাবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রচলিত সিসিটিভি ব্যবস্থায় কোনো নির্দিষ্ট এলাকার দৃশ্য দেখা গেলেও একটি লাগেজকে পুরো পথ ধরে অনুসরণ করা কঠিন। নতুন এআই প্রযুক্তির বড় সুবিধা হবে, লাগেজের গতিপথ শনাক্ত করে সেটিকে ক্যামেরা থেকে ক্যামেরায় অনুসরণ করা। নির্ধারিত রুট থেকে কোনো লাগেজ সরে গেলে সিস্টেম তা শনাক্ত করতে পারবে। কোনো স্থানে অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলেও সতর্ক সংকেত পাওয়ার সুযোগ থাকবে। এতে ব্যাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের গতিবিধিও নজরদারির আওতায় আসবে। বিমানমন্ত্রী ও সচিবের কক্ষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবে ক্যামেরা। বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সরাসরি প্রত্যক্ষ করবেন লাগেজের গতিবিধি। এ ছাড়া যাত্রীরা তাদের লাগেজের অবস্থান জানতে পারবেন বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে।
শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনার অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে একসঙ্গে অনেক ফ্লাইটের লাগেজ এলে বেল্ট এলাকায় চাপ বেড়ে যায়। যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কখনও একই সময়ে একাধিক ফ্লাইটের লাগেজ নিয়ে জট তৈরি হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে লাগেজ কোথায় আছে, তা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। দ্রুত লাগেজ সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সমন্বয়ের ঘাটতিও সমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া লাগেজে থাকা মালামাল খোয়া যাওয়া বা চুরির অভিযোগে যাত্রীদের ভোগান্তি তৈরি হয়। অভিযোগের পর ঘটনার সময় ও স্থান শনাক্ত করতেও অনেক ক্ষেত্রে সময় লাগে।
নতুন ব্যবস্থায় এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে ঘটনার পুরো গতিপথ অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি হবে। কোনো লাগেজ বিমান থেকে নামানোর পর কোথায় গেছে, কোন এলাকায় কতক্ষণ ছিল এবং কারা সেটি সরিয়েছে— প্রয়োজনে এসব তথ্য ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা সম্ভব হবে। ফলে দায়িত্ব নির্ধারণ ও অভিযোগ তদন্তে সহায়তা পাওয়া যাবে।
এই ক্যামেরায় অডিও বা ভয়েস ট্র্যাকিংয়ের সুবিধাও রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ শুধু দৃশ্য ধারণ নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী শব্দ বা কথোপকথন শনাক্তের প্রযুক্তিও ব্যবস্থাটির সঙ্গে যুক্ত করা হতে পারে। এতে ব্যাগেজ এলাকায় কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হলে সেটি শনাক্তের সক্ষমতা বাড়বে।
প্রস্তাবিত এআই ক্যামেরা নেটওয়ার্ককে সচিবালয়ের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর ফলে বিমানবন্দরের ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনার পরিস্থিতি দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। প্রয়োজনীয় এক্সেস থাকলে মন্ত্রী, ঊর্ধ্বতন সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সচিবালয়ের নিজ নিজ কক্ষ থেকেই লাইভ ফুটেজ দেখতে পারবেন। মোবাইল, ল্যাপটপ বা নির্দিষ্ট স্ক্রিনের মাধ্যমেও অনুমোদিত ব্যবহারকারীরা যে কোনো স্থান থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এর ফলে বিমানবন্দরের ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা শুধু ঘটনার পর পর্যালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং চলমান পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। কোথাও লাগেজ জমে গেলে, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় কোনো প্রক্রিয়া চললে কিংবা কোনো অনিয়ম দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে শুধু ক্যামেরা স্থাপন করলেই লাগেজ ব্যবস্থাপনার সব সমস্যা দূর হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিমানবন্দরের ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, জনবল, সরঞ্জাম, বেল্ট ব্যবস্থাপনা, ফ্লাইটের সময়সূচি ও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় সরাসরি জড়িত। এসব জায়গায় দুর্বলতা থাকলে প্রযুক্তির পাশাপাশি ব্যবস্থাপনাগত সংস্কারও প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে ব্যাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের প্রতিটি ধাপে দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে ক্যামেরার নজরদারির সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন।
এ বিষয়ে এসএম লাভলুর রহমান (সদস্য, প্রশাসন) বলেন, এআই প্রযুক্তি স্থাপনে কর্তৃপক্ষ আমাদের নির্দেশনা দিয়েছে। আমরা সে মোতাবেক কাজ করছি। এটি স্থাপন করা গেলে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আসবে। প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করা যাবে। বিমানের প্রতি যাত্রীদের আস্থা ফিরবে।
বিমানবন্দরের যাত্রীসেবায় লাগেজ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ফ্লাইটের যাত্রা নির্বিঘ্ন হলেও লাগেজ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা কিংবা লাগেজ হারানোর ঘটনা পুরো ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে নষ্ট করে দেয়। তাই প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির পাশাপাশি দ্রুত লাগেজ সরবরাহ, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।