তার দাবি, পশ্চিমা উদারপন্থীরা ফ্রান্সে তৃতীয় বিশ্বের মানুষকে নিয়ে এসেছে এবং অভিবাসীদের আত্মীকরণ ও সামাজিক সামঞ্জস্যের মৌলিক প্রশ্নগুলো উপেক্ষা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন বলেন, উন্মুক্ত সীমান্তের নীতি অনুসরণ করায় ফ্রান্স বিশৃঙ্খলার দিকে যাচ্ছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক ডেমোক্র্যাটরাও একই পথে এগোচ্ছেন। সিনেটর এরিক স্মিটও ফ্রান্সের পরিস্থিতির জন্য বামপন্থীদের দায়ী করেন।
তবে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও তরুণেরা একই ধরনের সংকটের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন। স্পেন, পর্তুগাল ও ইতালিতে শিক্ষায় অপর্যাপ্ত অর্থায়ন, আবাসন ব্যয় এবং জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে।
রিপাবলিকান নেতারা আপাতত ফ্রান্সের পরিস্থিতির ওপরই মনোযোগ ধরে রাখতে চান। জাতীয় পরিচয় হুমকির মুখে—এমন বক্তব্যের মাধ্যমে তারা ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের পক্ষে সমর্থন জোরদার করতে চাইছেন।
ভ্যান্স মার্কিন ভোটারদের ফ্রান্সের পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা ভোট দেওয়ার সময় আশা করি বিষয়টি খেয়াল রাখবেন। এটাই সেই ভবিষ্যৎ, যা ডেমোক্র্যাটরা আপনাদের দেশের জন্য চান।’
ট্রাম্পের বক্তব্যে ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র্যালির অবস্থানের প্রতিফলনও দেখা গেছে। দলটির সভাপতি জর্দান বারদেলা সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থী চরমপন্থা ও শহরতলির অপরাধপ্রবণ জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত ভূমিকার কথা বলেছেন। এর আগে ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রকাশ্যে মেরিন লে পেনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
মুসলিমবিদ্বেষ উসকে দিলেন ট্রাম্প
কানসাসে নির্বাচনী সমাবেশে ডেমোক্র্যাটদের আক্রমণ করতে গিয়ে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এ সময় তিনি মিশিগানের সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ, কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর ও রাশিদা তালাইবকে আক্রমণ করেন। শুধু তাই নয়, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মধ্যনামও অপ্রাসঙ্গিকভাবে টেনে আনেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘ডেমোক্র্যাটরা আবদুল মোহাম্মদ এল-সাইয়েদের দল।’ এরপর এল-সাইয়েদের নাম নিয়ে নিজের মন্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে ট্রাম্প বলেন, প্রার্থীর প্রথম নামের পরিবর্তে তাকে ‘মোহাম্মদ এল-সাইয়েদ’ বলে সংবোম্বোধন করার সিদ্ধান্তটি ছিল তার জন্য দারুণ কৌশল।
এল-সাইয়েদ তার নাম এভাবে বলায় অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন বলেও দাবি করেন ট্রাম্প। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি তাকে মোহাম্মদ বলেছি, কারণ আমার ইচ্ছা হয়েছে। কেউ একজন জিজ্ঞেস করেছিল, আমি এটা কীভাবে করলাম। আমি বলেছি, আমি প্রেসিডেন্ট, যাকে যা খুশি নামে ডাকতে পারি।’
স্বার্থসিদ্ধির অভিযোগে ট্রাম্পের সমর্থন তলানিতে
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমতে কমেতে এবার নিম্নস্তরে গিয়ে ঠেকেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রকাশিত এক নতুন জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, প্রেসিডেন্টের পদ ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়াচ্ছেন ট্রাম্প।
ওয়াশিংটন পোস্ট ও এবিসি নিউজের যৌথ জরিপে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থনের হার পাওয়া গেছে ৩৩ শতাংশ। আর রয়টার্স/ইপসোসের জরিপে অংশ নেওয়া ৬৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের পদকে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার কাজে ব্যবহার করছেন। তাদের মধ্যে রিপাবলিকান সমর্থকও রয়েছেন ৩৪ শতাংশ। গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় এ ধরনের ধারণা পোষণকারীর হার বেড়েছে ১২ শতাংশ।
যদিও ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় ফিরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ‘নতুন স্বর্ণযুগ’ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে জরিপে অংশ নেওয়া ৪৮ শতাংশ বলেছেন, ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর তাদের আর্থিক অবস্থা আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮৬ সাল থেকে পরিচালিত এ ধারার জরিপে কোনো প্রেসিডেন্টের আমলে আর্থিক অবস্থার অবনতির কথা বলা মানুষের এটিই সর্বোচ্চ হার।
এ ছাড়া ৬৭ শতাংশ মর্কিন নাগরিক মনে করেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় ট্রাম্প আন্তরিক নন। হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে সিএনএন, এমএস নাউ ও পলিটিকোকে নিষিদ্ধ করার প্রচেষ্টা নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে দীর্ঘ বিরোধের পর এক ফেডারেল বিচারক নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে সাময়িক বাধা দিয়েছেন।
জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নিয়েও ব্যাপক হতাশার চিত্র উঠে এসেছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘তেমন ভালো নয়’ অথবা ‘খারাপ’ বলে মূল্যায়ন করেছেন ৭৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। অন্যদিকে অর্থনীতি পরিচালনায় ডেমোক্র্যাটদের ওপর আস্থা রয়েছে ৩৭ শতাংশের, যেখানে রিপাবলিকানদের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন ২৮ শতাংশ।
নির্বাচনে অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে ট্রাম্প আন্তরিক নন বলে মনে করেন ৬১ শতাংশ উত্তরদাতা। ২০২৫ সালের অক্টোবরের তুলনায় এ হার বেড়েছে পাঁচ শতাংশ পয়েন্ট।
প্রসঙ্গত, গত ফেব্রুয়ারিতে মিত্র ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক আগ্রাসন শুরু করার পর দেশে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নামতে থাকে। ওই যুদ্ধের জেরে সারা বিশ্বে পেট্রলের দাম বেড়ে গেছে, দৈনন্দিন ব্যয় সামলাতে মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষও একই ধরনের চাপে রয়েছে। ৬৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক অর্থনীতি সামলানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে অসন্তুষ্ট। তাদের মধ্যে ৩৭ শতাংশ নিজেদের রিপাবলিকান সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
শক্ত ঘাঁটিতেও বিপর্যয়ের আশঙ্কা
শুধু জরিপেই নয়, বস্তবেও রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা স্পষ্ট হয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে কানসাস সফর করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প । দীর্ঘ আট বছর পর গতকাল সোমবার অঙ্গরাজ্যটিতে প্রথম নির্বাচনী সমাবেশ করেন তিনি। সেখানে তার ৯৮ মিনিটের দীর্ঘ বক্তব্যের চেয়েও ট্রাম্পের উপস্থিতি রিপাবলিকানদের কঠিন পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিয়েছে।
কানসাস অঙ্গরাজ্য রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৩২ সালের পর থেকে অঙ্গরাজ্যটি থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর নির্বাচিত হননি। তবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় এবার অঙ্গরাজ্যটিতে রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের আধিপত্যে ভাঙন ধরার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অঙ্গরাজ্যটিতে রিপাবলিকানদের আসন ধরে রাখতে ট্রাম্পের প্রচারের কেন্দ্রে ছিলেন প্রথম মেয়াদে থাকা সিনেটর রজার মার্শাল। সেখারে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটনের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছেন তিনি। হ্যামিলটন একজন মেথডিস্ট গির্জার জ্যেষ্ঠ যাজক।

জনমত জরিপে দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারের তৃতীয় প্রান্তিকে হ্যামিলটন প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ডলার অনুদান সংগ্রহ করেছেন। বিপরীতে মার্শালের সংগ্রহ মাত্র আট লাখ ডলার। রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিতে এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণও হারাতে পারে ট্রাম্পের দল
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের এক বা উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে বাধা বাড়তে পারে। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও ভেটো ক্ষমতা ও নির্বাহী কর্তৃত্বের কারণে ট্রাম্পের হাতে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা থাকবে।
বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি, ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি, ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি। দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাল্টাতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি করে আসন বাড়াতে হবে।
তবে জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ দলটি পেতে পারে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হলেও সিনেটের লড়াই এখনো অনিশ্চিত।