মামদানিকে খুব দ্রুতই একটি পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। নির্বাচনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যখন ব্রুকলিনের একটি ইহুদি ডে স্কুলের দেয়ালে ইহুদি-বিরোধী গ্রাফিতি লেখা পাওয়া যায়, তখন নবনির্বাচিত মেয়র ঘটনাটির নিন্দা জানান।
তিনি এক্স-এ পোস্ট করেন, ‘মেয়র হিসেবে আমি আমাদের ইহুদি প্রতিবেশীদের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াব এবং আমাদের শহর থেকে ইহুদি-বিরোধিতার অভিশাপকে সম্পূর্ণরূপে দূর করতে কাজ করব।’
‘গ্লোবালাইজ দ্য ইনতিফাদা’
মামদানির বিরোধী ইহুদি সম্প্রদায়ের সদস্যরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, মামদানি ‘গ্লোবালাইজ দ্য ইনতিফাদা’ বাক্যটির নিন্দা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এই স্লোগানটি ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থনসূচক হলেও, কেউ কেউ একে ইহুদি জনগণের বিরুদ্ধে সহিংসতার আহ্বান হিসেবে ব্যাখ্যা করে থাকেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের জুলাই মাসের এক প্রতিবেদনের মতে, মনোনয়নের পর মামদানি ব্যক্তিগতভাবে একদল ব্যবসায়িক নেতাকে জানান, তিনি নিজে এই বাক্যটি ব্যবহার করবেন না এবং অন্যদেরও তা ব্যবহার না করতে উৎসাহ দেবেন।
মামদানি বলেছেন, তিনি বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাংশনস বা বিডিএস আন্দোলনকে সমর্থন করেন। যা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বয়কটের আহ্বান জানায়।
গত সপ্তাহে অ্যান্টি-ডিফেমেশন লীগ (এডিএল) ‘মামদানি মনিটর’ নামে একটি উদ্যোগ চালু করেছে। এর মাধ্যমে তার নির্বাহী নিয়োগ এবং অন্যান্য পদক্ষেপ ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্য সম্ভাব্য ক্ষতিকর কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। একইসঙ্গে, নিউইয়র্কের বাসিন্দাদের জন্য একটি হটলাইন চালু করা হয়েছে, যাতে তারা ইহুদি-বিরোধী কোনো ঘটনার প্রতিবেদন করতে পারেন। সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী জোনাথন গ্রিনব্লাট বলেন, ‘আমাদের কাজ খুবই সহজ — ইহুদি জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া।’
ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা
গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের ভেতর বিভাজনের মধ্যেই রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইহুদি ভোটারদের উদ্দেশে বলেছেন, তার দলই তাদের জন্য আরো উপযুক্ত আশ্রয়স্থল। এক্সিট পোল অনুযায়ী ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট কামালা হ্যারিস শ্বেতাঙ্গ ইহুদি ভোটের ৭৯ শতাংশই পেয়েছিলেন। এই আহ্বান এসেছে সেই প্রেক্ষাপটেও। ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একনিষ্ঠ সমর্থক।
মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, কোনো ইহুদি ভোটার যদি মামদানিকে সমর্থন করে, তবে তিনি একজন ‘মূর্খ ব্যক্তি।’ রিপাবলিকানরা পরিকল্পনা করছে মামদানির নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাটিকে কাজে লাগিয়ে আগামী বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে আরো বেশি ইহুদি সমর্থন অর্জন করতে। তবে এখানে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণই মূল দৌড়ের বিষয়। এই সমর্থন নিউইয়র্ক শহরের উত্তরের সুইং জেলা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যেখানে বর্তমানে রিপাবলিকান মাইক ললার প্রতিনিধিত্ব করছেন।
নিউইয়র্কের মেয়রের সরকারি বাসভবনের প্রসঙ্গ টেনে রিপাবলিকান কৌশলবিদ ফোর্ড ও’কনেল বলেন, ‘গ্রেসি ম্যানশনে মামদানির উত্থান রিপাবলিকানদের জন্য খেলার নিয়মটাই বদলে দিতে পারে, যা তাদের মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে প্রভাব আরো দৃঢ় করবে ‘
মামদানি আগামী বছরের নিউইয়র্ক গভর্নরের নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও বটে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এলিস স্টেফানিক গত সপ্তাহে ঘোষণা করেছেন, তিনি রিপাবলিকান মনোনয়নের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন এবং ডেমোক্র্যাট গভর্নর ক্যাথি হোকুলকে মামদানিকে সমর্থন করার জন্য তীব্র সমালোচনা করেছেন।
এক বিভক্ত ভোটব্যাংক
শহরের উচ্চ ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ মামদানির নির্বাচনী প্রচারের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল। ফলে তরুণ প্রগতিশীল ভোটারদের সমর্থন পান মামদানি। মামদানির সমালোচক গ্রিনব্লাটের মতো ব্যক্তিরাও স্বীকার করেছেন, তার জয়ের পেছনে মূল কারণ ছিল নাগরিকদের অর্থনৈতিক সমস্যার প্রতি তার অবিচল মনোযোগ।
মামদানির ইহুদি সমর্থকেরা বলছেন, এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে ইহুদি ভোট মোটেও একক কোনো মনোভাব বা দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে না। একজন ইসরায়েলি নাগরিক মামদানির প্রচারে সরাসরি কাজ করেছেন।
২৬ বছর বয়সী রনি জাহাভি-ব্রুনার বলেন, ‘আমি মামদানিকে সমর্থন করি শুধু ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন নিয়ে তার অবস্থানের কারণে নয়, বরং ওই অবস্থানের কারণেই।’ তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না যে গণহত্যার বিরুদ্ধে কথা বলা কোনো বড় ঝুঁকি।’
অন্যদিকে, কেউ কেউ ৬৭ বছর বয়সী অ্যান্ড্রু কুয়োমোর পাশে দাঁড়িয়েছেন শুধুমাত্র তার ইসরায়েলপ্রীতির কারণে। ৫০ বছর বয়সী অ্যালিসন ডেভলিন ম্যানহাটনের আপার ইস্ট সাইডের এক ইহুদি বাসিন্দা। তিনি কুয়োমোকে ভোট দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি ভীষণ হতাশ। আমি নিঃসন্দেহে উদ্বিগ্ন, কারণ আমি প্রকাশ্যে ইহুদি, প্রকাশ্যে জায়নিস্ট।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি জানি না এখন কী হবে। জানি না এই ঘটনার পর আমি শহরে থাকব কি না।’
২৭ বছর বয়সী কোরিন গ্রিনব্লাট শহরের উচ্চশিক্ষা খাতে কাজ করেন। তিনি মামদানির সেই প্রচেষ্টাকে প্রশংসা করেন, যেখানে তিনি ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে আগ্রহী ছিলেন। কোরিন গ্রিনব্লাট বলেন, ‘গাজার যুদ্ধ এখন ইহুদি রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন এনেছে। এখন স্পষ্ট যে, কেউ কেউ ফিলিস্তিনপন্থী ইহুদি, কেউ ইসরায়েলপন্থী ইহুদি, আবার কেউ কেউ আছেন যাদের ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই।’
ব্রুকলিনের রাব্বি অ্যান্ড্রু কাহন বলেন, মামদানি বারবার ইহুদি-বিরোধিতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং এডিএল-এর মতো সংগঠনগুলোর সমালোচনা করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘চলুন, আমরা তাকে একটি সুযোগ দিই। যেন তিনি প্রমাণ করতে পারেন, ইহুদি-বিরোধিতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার প্রতিশ্রুতি সত্যিকারের। তার সঙ্গে কাজ করে এমন এক আন্তঃসম্প্রদায়িক সংহতি গড়ে তুলি, যা সব নিউইয়র্কবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।’