জাহিদ ইকবাল,
কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া মানে শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; যেন ইতিহাসের সঙ্গে মুখোমুখি বসা। কিছু মানুষের পাশে কয়েক ঘণ্টা কাটানো মানে সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলা। মনে হয়, ঘড়ির কাঁটা থেমে গেছে, অথচ ইতিহাস কথা বলে চলেছে। গতকাল আমার জীবনে ঠিক এমনই একটি দিন এসেছিল। এমন একটি বিকেল, যা হয়তো ক্যালেন্ডারের একটি সাধারণ তারিখ হিসেবেই থেকে যাবে, কিন্তু আমার স্মৃতির ভাণ্ডারে তা হয়ে থাকবে এক অনন্য প্রাপ্তি।

হঠাৎ করেই ফোন বেজে উঠল। ওপাশ থেকে ভেসে এলো একটি চেনা, স্নেহমাখা কণ্ঠ—“জাহিদ, কোথায় আছো? আমি আসছি, তোমার সঙ্গে দেখা করতে।”
কণ্ঠটি ছিল আমাদের খিলক্ষেতের সবার প্রিয় আবুল হোসেন দর্জির—অর্থাৎ আমাদের অশেষ শ্রদ্ধার আবুল মামার।
কথাটি শুনে আমি মুহূর্তের জন্য নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ, আমি নিজেই ঠিক করেছিলাম দু-এক দিনের মধ্যে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাব। কিন্তু ভালোবাসার মানুষেরা অপেক্ষা করতে জানেন না। তাঁরা সম্পর্ককে সময়ের ওপর ছেড়ে দেন না, নিজেরাই ভালোবাসার পথ হেঁটে চলে আসেন। আবুল মামাও তেমনই একজন মানুষ। তাঁর এই ছোট্ট উদ্যোগের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক বিশাল হৃদয়ের পরিচয়।
নিকুঞ্জের একটি রেস্টুরেন্টে আমরা বসেছিলাম। সঙ্গে ছিলেন জনাব সিরাজ ও শামসুল আলম স্যার ও আমার ছেলে তাসবির ইকবাল।
বাইরে নগরজীবনের ব্যস্ততা, আর ভেতরে আমাদের টেবিলে বসে যেন ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছিল খিলক্ষেতের কয়েক দশকের ইতিহাস। কথার পর কথা, স্মৃতির পর স্মৃতি, মানুষের গল্প, মুক্তিযুদ্ধের গল্প, খিলক্ষেতের গল্প—সময় যে কখন কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে গেল, আমরা কেউই বুঝতে পারিনি।
আমার বিশ্বাস, প্রতিটি জনপদেরই কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা নিজেরাই একটি ইতিহাস। তাঁদের মুখে শোনা একটি ঘটনা অনেক সময় শত পৃষ্ঠার বইয়ের চেয়েও বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে। আবুল হোসেন দর্জি সেই বিরল মানুষদের একজন। তিনি শুধু একজন প্রবীণ নন; তিনি একটি চলমান ইতিহাস, একটি জীবন্ত দলিল, একটি জনপদের স্মৃতির ভাণ্ডার।
আমাদের আলোচনার বড় একটি অংশজুড়ে ছিল তাঁর লেখা অসাধারণ গ্রন্থ ‘বেলা শেষের গল্প’। পাশাপাশি উঠে এলো তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতাকে নিয়ে প্রকাশিতব্য বইয়ের কথাও। তাঁর কথার ভেতরে আমি একজন লেখককে দেখেছি, একজন গবেষককে দেখেছি, আবার একজন দায়িত্ববান ইতিহাস-সংরক্ষককেও দেখেছি।
আমি বইটি একবার নয়, একাধিকবার পড়েছি। প্রতিবারই মনে হয়েছে, আমি কোনো বই পড়ছি না; বরং হাঁটছি পুরোনো খিলক্ষেতের অলিগলি ধরে। বইয়ের প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি স্মৃতি আমাকে টেনে নিয়ে গেছে সেই সময়ে, যখন মানুষের পরিচয় ছিল সততায়, প্রতিবেশী ছিল পরিবারের মতো, আর দেশপ্রেম ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় অহংকার।
আমার জানা মতে, খিলক্ষেতকে নিয়ে এত তথ্যসমৃদ্ধ, এত আন্তরিক এবং এত মানবিক ভাষায় লেখা বই আর নেই। কেউ যদি আগামী দিনে খিলক্ষেতের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ, সংস্কৃতি কিংবা মুক্তিযুদ্ধে এ জনপদের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করতে চান, আমি নির্দ্বিধায় বলব—‘বেলা শেষের গল্প’ তাঁর অন্যতম নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স হয়ে থাকবে। ইতিহাসকে ভালোবাসা মানুষদের জন্য এই বই শুধু একটি গ্রন্থ নয়, এটি এক অমূল্য দলিল।
আমাদের আলোচনার এক পর্যায়ে উঠে এলো ১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিলের এক হৃদয়বিদারক অধ্যায়। আবুল মামা শান্ত কণ্ঠে জানালেন, কীভাবে বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে নবাগত তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের রাজবাড়িতে নিয়ে একটি কক্ষে আটকে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে হত্যা করা হয়েছিল। সেই নির্মম হত্যাযজ্ঞে শহীদ হয়েছিলেন আমার মেজো মামা খিলক্ষেতের প্রথম শহীদ শাহজাহান সরকারসহ বহু তরুণ সেনা কর্মকর্তা।
তাঁর কথাগুলো শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, ইতিহাস যেন কোনো বইয়ের পাতা নয়; ইতিহাস আমার সামনে বসে নিজের চোখে দেখা সত্যগুলো বলছে।
আবুল মামা বললেন, “সমগ্র সরকার বাড়িতে নয়, পুরো খিলক্ষেতে শাহজাহানের মতো সুঠাম, স্মার্ট ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন যুবক আর ছিল না।”
এই একটি বাক্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে একটি প্রজন্মের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর বেদনা। একজন শহীদের পরিচয় শুধু তাঁর মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর স্বপ্ন, তাঁর চরিত্র, তাঁর দেশপ্রেম এবং তাঁর অসমাপ্ত জীবনের মধ্যেও তিনি বেঁচে থাকেন।
আজ আমরা যে খিলক্ষেতকে দেখি—প্রশস্ত সড়ক, উঁচু ভবন, আধুনিক জনপদ, ব্যস্ত নগরজীবন—তার পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের ঘাম, ত্যাগ, সংগ্রাম এবং আত্মদানের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী ও ধারক আবুল হোসেন দর্জিদের প্রজন্ম।
তাঁরা যদি তাঁদের স্মৃতিগুলো লিখে না রাখতেন, যদি তাঁদের অভিজ্ঞতা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে না নিতেন, তাহলে হয়তো খিলক্ষেতের ইতিহাসের অনেক মূল্যবান অধ্যায় চিরদিনের মতো হারিয়ে যেত। ইতিহাস হারিয়ে যায় একদিনে নয়; ইতিহাস হারিয়ে যায় যখন ইতিহাস জানার মানুষগুলোকে আমরা অবহেলা করি।
আমাদের সমাজের একটি বড় সংকট হলো—আমরা প্রায়ই দূরের মানুষকে নিয়ে গর্ব করি, কিন্তু নিজের আশপাশের মহৎ মানুষদের যথাযথ মূল্যায়ন করি না। তাঁরা যখন আমাদের মাঝে থাকেন, তখন আমরা তাঁদের গুরুত্ব বুঝতে শিখি না। অথচ তাঁরা চলে যাওয়ার পরই উপলব্ধি করি, আমরা কত বড় সম্পদ হারিয়েছি।
আমি মনে করি, জীবন্ত কিংবদন্তিদের মূল্যায়ন তাঁদের জীবদ্দশাতেই হওয়া উচিত। কারণ, তাঁরা চলে গেলে শুধু একজন মানুষ চলে যান না; তাঁর সঙ্গে চলে যায় অগণিত অপ্রকাশিত স্মৃতি, অমূল্য অভিজ্ঞতা এবং ইতিহাসের এমন অনেক সত্য, যা আর কোনো দিন ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।
আবুল হোসেন দর্জির সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর বিনয়। এত ইতিহাস জানা, এত অভিজ্ঞতার অধিকারী হওয়ার পরও তাঁর মধ্যে অহংকারের লেশমাত্র নেই। তিনি সহজ মানুষ, প্রাণখোলা মানুষ, আন্তরিক মানুষ। তাঁর সঙ্গে বসলে কখনো মনে হয় না, তিনি নিজের কথা বলছেন; বরং মনে হয়, তিনি তাঁর প্রিয় খিলক্ষেতের কথাই বলে চলেছেন। এই মাটির প্রতি তাঁর ভালোবাসাই তাঁকে আমাদের কাছে অসাধারণ করে তুলেছে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। কারণ, এমন একজন মানুষের সান্নিধ্য আমার হয়েছে। তাঁর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আমাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। নিজের মাটিকে ভালোবাসতে শেখায়। নিজের শেকড়কে চিনতে শেখায়। বুঝতে শেখায়, ইতিহাস কেবল বইয়ে লেখা থাকে না; ইতিহাস বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতিতে, মানুষের কথায়, মানুষের জীবনযাপনে।
আজ আমরা উন্নয়নের কথা বলি, আধুনিকতার কথা বলি, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি। কিন্তু যে শেকড় আমাদের এই অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে, সেই শেকড়কে ভুলে গেলে কোনো উন্নয়নই অর্থবহ হয় না। যে জাতি নিজের ইতিহাসকে সম্মান করতে শেখে না, সে জাতি একদিন নিজের পরিচয়ও হারিয়ে ফেলে।
আবুল হোসেন দর্জি শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি সময়ের প্রতিনিধি। তিনি সেই প্রজন্মের কণ্ঠস্বর, যারা নিজের স্বার্থের আগে সমাজকে, এলাকার আগে দেশকে এবং ব্যক্তিগত প্রাপ্তির আগে মানুষের কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—মানুষ বড় হয় পদ-পদবিতে নয়; বড় হয় কর্মে, সততায় এবং মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আগামী একশ বছর পরও যখন খিলক্ষেতের ইতিহাস লেখা হবে, তখন আবুল হোসেন দর্জির নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে। কারণ, তিনি শুধু ইতিহাসের সাক্ষী নন; তিনি ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার এক নিরলস প্রহরী। তাঁর কলম, তাঁর স্মৃতি, তাঁর জীবনদর্শন আগামী প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য সম্পদ।
প্রিয় আবুল মামা, আপনার প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা, আন্তরিক কৃতজ্ঞতা এবং অফুরন্ত ভালোবাসা রইল। মহান আল্লাহ আপনাকে সুস্থতা, দীর্ঘায়ু ও শান্তিময় জীবন দান করুন। আপনার অভিজ্ঞতার আলোয় আরও অনেক তরুণ আলোকিত হোক। আপনার স্মৃতি আমাদের পথ দেখাক, আপনার জীবন আমাদের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকুক।
আমরা চাই, আপনি আমাদের মাঝেই থাকুন। আপনার গল্পগুলো আমাদের সন্তানদের কাছে পৌঁছাক। আপনার বলা ইতিহাস আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিচয়ের ভিত্তি হয়ে উঠুক।
কারণ, ইতিহাস শুধু সংরক্ষণ করার বিষয় নয়; ইতিহাস উত্তরাধিকার হিসেবে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ারও দায়িত্ব।
কিছু মানুষ কখনো শুধু একজন মানুষ নন। তাঁরা একটি জনপদের বিবেক, একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি, একটি ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। আবুল হোসেন দর্জি তেমনই একজন। তাঁকে সম্মান করা মানে খিলক্ষেতকে সম্মান করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সম্মান করা, নিজের শেকড়কে সম্মান করা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য ইতিহাসকে জীবন্ত রেখে যাওয়া।
লেখক পরিচিতি: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সমাজকর্মী। সভাপতি, নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি। দীর্ঘদিন ধরে খিলক্ষেত, নিকুঞ্জ ও রাজধানীর নাগরিক সমস্যা, স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি ও জনসম্পৃক্ত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত।