ঢাকার চারশ বছরের ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতির নানা অজানা গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে গবেষক ও সাংবাদিক রিদওয়ান আক্রামের নতুন বই ‘পুনশ্চ ঢাকা’। বইটি প্রকাশ করেছে কথা প্রকাশ।
ঢাকাকে নিয়ে লেখার উপাদান শেষ হওয়ার নয়। বারবার ঢাকা ফিরে আসে তার অতীতের গল্প নিয়ে।সেই গল্পগুলো কখন শোনায় সেই সোনালি অতীতের কথা আবার কখনো বা ফিসফিস করে জানান দেয় প্রায় ধ্বংস হতে যাওয়া কোনো শহরের কথা। গল্পের মতো মনে হলেও আদতে তো এগুলো ইতিহাসই। এ বইয়ে সেই ইতিহাসের ভেতরেই খোঁজা হয়েছে ঢাকার সমাজ ও সংস্কৃতিকে। মোটা দাগে বললে ঢাকার চার শতকের কথা।পাঠকের কথা ভেবেই ‘পুনশ্চ ঢাকা’ লেখাগুলোকে সাজানো হয়েছে- ‘প্রতিষ্ঠাতা’, ‘যানবাহন’, ‘উৎসব’, ‘প্রশাসন’, ‘হারানো পেশা’, ‘চিত্রকলা’, ‘লড়াই’, ‘নিসর্গ’ এবং ‘অতিথি’ বিভাগে। ১৮৪ পৃষ্ঠার বইটির প্রচ্ছদ করেছেন সব্যসাচী হাজরা। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ৪০০ টাকা।
এই বইয়ের প্রথম রচনা ‘মোগল রাজধানী ঢাকার প্রতিষ্ঠাতার সমাধির খোঁজে’।ঢাকা যে রাজধানী হয়ে উঠতে পারলো সেটার কৃতিত্ব দিতে হবে মোগল সুবাদার সুবাদার ইসলাম খাঁ চিশতিকে। মূলত তাঁর হাত ধরেই সেই ৪০০ বছর আগে ঢাকা হয়েছিল রাজধানী। ঢাকাকে নিয়ে গবেষণায় ঢাকার নানা বিষয় উঠে এলেও ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে হিসেবে ইসলাম খাঁ চিশতিকে নিয়ে সেভাবে কাজ করা হয়নি। ঢাকা নিয়ে শত শত প্রকাশনা হলেও সেখানে তাঁর সমাধির কোনো আলোকচিত্র বা চিত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। সেই অভাববোধ থেকেই বলা চলে লেখা হয়েছে ‘পুনশ্চ ঢাকা’তে স্থান পাওয়া প্রথম রচনা ‘মোগল রাজধানী ঢাকার প্রতিষ্ঠাতার সমাধির খোঁজে’।
এতে মূলত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খোঁজা চেষ্টা করেছি। ইসলাম খাঁর মৃত্যুর সময় থেকে শুরু করে কীভাবে তাঁর দেহ হাজির হয়েছিল ঢাকা থেকে প্রায় ১৭০৬ কিলোমিটার দূরত্বের ফতেহপুর সিক্রিতে? আর কেনই বা তাঁর দেহ নিয়ে যাওয়া হলো এখান থেকেই। কীভাবেই বা নিশ্চিত হওয়া গেছে তাঁর সমাধি ফতেহপুর সিক্রিতেই আছে? সেসবের প্রশ্নের মধ্যে বড় জিজ্ঞাসা ছিল কীভাবে তিনি মারা গিয়েছিলেন গাজীপুরের ভাওয়ালের বনে? এসব উত্তর আমারে মাঝে ছিল গত দুই দশক ধরেই। কিন্তু উত্তরগুলো কোথাও যথাযথভাবে পাচ্ছিলাম না। আর ৪১২ বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার রহস্য ভেদ করাটাও কঠিন এক কাজ।মোগল সেনাপতি মির্জা নাথানের লেখা ‘বাহারিস্থান-ই-গায়বি’তে ইসলাম খাঁর মৃত্যু নিয়ে সর্বোচ্চ ৩৬১ শব্দ লিখেছেন। সেগুলোকে সূত্র ধরে দুই প্রখ্যাত চিকিৎসকের সুচিন্তিত মতামতের মাধ্যমে একটি সুনিদিষ্ট এবং যৌক্তিক সিদ্বাšত্ম দিয়েছি কীভাবে ঢাকার প্রথম সুবেদার ইসলাম খাঁ মৃত্যু হয়েছিল। শুধু তাই নয় ইসলাম খাঁর মৃতদেহ নিয়ে ঢাকায় প্রবেশের আগেই ১২.৮৮ কিলোমিটার দূরে থাকতেই তাঁরা একটা বিরতি নিয়ে ‘শোকাচার’ পালন করেছিলেন। সেটা জায়গাটা আজকের দিনে কোথায়-সেটাও বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এক বৈমানিকের সাহায্যে বের করেছি। এরপর ইসলাম খাঁর ঢাকায় মৃতদেহ নিয়ে আসার পর তাঁকে দাফন করা হয় ‘বাগ-ই-শাহি’তে। কেন এমনটা করা হয়েছিল কিংবা ‘বাগ-ই-শাহি’ই বা কোথায় ছিল? কতদিন এখানে ছিল ইসলাম খাঁর দেহ? কেনই বা তাঁর দেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ফতেহপুর সিক্রিতে। কীভাবেই বা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? এরকম খুটিনাটি অনেক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে এই বইয়ের প্রথম লেখাটিতে। এ রকম অনেক প্রশ্নের উত্তরই এই বইয়ের প্রায় সব লেখাতেই খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। এক কথায় বলতে গেলে পাঠক হিসেবে ঢাকা সংশ্লিষ্ট অনেক প্রশ্নের খোঁজার ফলস্বরূপ হচ্ছে এই ‘পুনশ্চ ঢাকা’। ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক দেশকালের ঈদসংখ্যাতেই প্রকাশিত হয়েছে।
বইটির দ্বিতীয় রচনা ‘যানবাহন’ বিভাগে স্থান পাওয়া ‘হাওয়ার গাড়ি চইল্লা গেল…’। এর আগে ‘ঢাকার কোচোয়ানরা কোথায়’ নামে স্থান পেয়েছিল আমার দ্বিতীয় বই ‘ঢাকার কোচোয়ানরা কোথায়’-এ। পরবর্তী সেটিকে আরো বেশ কিছু তথ্যযোগে বর্ধিত করা হয়েছে। সেটি ছাপা হয়েছিল বেঙ্গল ফাউন্ডশনের ‘বেঙ্গলবারতা’ পত্রিকার উদ্বোধনী সংখ্যায়।‘ঢাকার নৌযান’ জায়গা পেয়েছিল ২০১১ সালের ইত্তেফাক ঈদসংখ্যায়। ‘ঢাকায় কোরবানির ঈদ’ দৈনিক সমকালের ঈদ সংখ্যায়। বইয়ের অধিকাংশ লেখাই ২০১০ থেকে ২০১২ সময়কালের মধ্যে ছাপা হয়েছে দৈনিক কালের কণ্ঠে। ২০১০ সালে ঢাকার রাজধানী হওয়ার চারশত বছর পূর্তিতে সেবছরের জুন মাসে দৈনিক কালের কণ্ঠ ধারাবাহিকভাবে তিনটি বিশেষ সংখ্যা বের করে। সেখানে স্থান পেয়েছিল ‘রেনেলের ঢাকা’ আর ‘ঢাকার অদেখা ছবি’।
বইটির লেখাগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় ছবিগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে নানা উৎস থেকে। সেসবের মধ্যে অধিকাংশই ব্রিটিশ লাইব্রেরির সংগ্রহ। আর বাকিগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে জাতীয় জাদুঘর প্রকাশিত ‘আলোকচিত্রে সেকালের ঢাকা’, এফ বি ব্র্যাডলি-বার্টের ‘দ্য রোমান্স অব এন ইস্টার্ন ক্যাপিটাল’, দ্য ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিন পরিচালিত ‘দ্য সুলভিনস প্রজেক্ট’, উইকিপিডিয়া, ‘দ্য ডায়েরি অব উইলিয়াম হেজেস, (আফটারওয়ার্ডস স্যার উইলিয়াম হেজেস), ডিওরিং হিজ এজেন্সি ইন বেঙ্গল: এজ ওয়েল এজ অন ইজ ভয়েজ আউট অ্যান্ড রিটার্ন ওভারল্যান্ড (১৬৮১-১৬৯৭) (ভলিউম-১)’, বাংলাদেশ ওল্ড ফটো আর্কাইভ’, ‘দ্য গ্রাফিক’, ‘দ্য ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়াম’, ‘বেন এলাস’, ‘নগর জাদুঘর’, ‘লাইফ ম্যাগাজিন’, ‘শায়লা পারভীনের ব্যক্তিগত সংগ্রহ’, ‘রয়েল জিয়োগ্রাফিক্যাল সোসাইটি পিকচার লাইব্রেরি এবং লেখকের নিজের তোলা ছবি।
এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ..