এদিকে, মা ইলিশ রক্ষায় প্রশাসন যখন নদীতে অভিযান চালাচ্ছে, তখন বন্দরের ভেতর চলছে নিষিদ্ধ ট্রলিং ট্রলার মেরামত ও নির্মাণের ব্যস্ততা। নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলেরা।অথচ সরকারি নির্দেশনায় এখন ট্রলিং ট্রলার নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ বাস্তবে এই নিষেধাজ্ঞার ছিটেফোঁটাও নেই সরকারি এই মৎস্য বন্দরে।আলীপুর বন্দরে ঢুকলেই এখন দেখা মেলে এক ব্যস্ত কর্মচাঞ্চল্য। কোথাও কাঠ কাটা হচ্ছে, কোথাও চলছে লোহার পাত জোড়া লাগানো, কেউ পুরনো ইঞ্জিনে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে দিচ্ছেন।
স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, তারা নিয়মিত নজরদারি চালান। কিন্তু আলীপুর ঘাট ঘুরে কেএম বাচ্চু দেখেছেন, অন্তত ছয়টি বড় ওয়ার্কশপে ট্রলিং ট্রলারের মালামাল খোলা মাঠে পড়ে আছে। কোথাও কাঠ শুকোচ্ছে, কোথাও রং করা হচ্ছে। অবৈধ ট্রলিং ট্রলারের কাজ চলছে সরকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রেই।
ওয়ার্কশপ মালিক জাকির হোসেন দাবি করলেন, ‘আমরা শুধু পুরনো বোট মেরামত করি।’ কিন্তু পাশে নতুন কাঠের কিল, লোহার যন্ত্রপাতি ও রংয়ের গন্ধ জানিয়ে দিচ্ছিল—এ শুধু সারাই নয়, নতুন ট্রলিং ট্রলার নির্মাণও চলছে।
ট্রলার মালিকদের সাফাই
কলাপাড়ার আলীপুর, মহিপুর ও কুয়াকাটায় প্রায় অর্ধশতাধিক ট্রলিং ট্রলার আছে। স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৯ জন মালিকের ২৩টি ট্রলার অবৈধভাবে চলছে। তাদের মধ্যে চার মালিক আবুল হোসেন, বেল্লাল হোসেন, কামাল হোসেন ও আব্দুল জলিলের দাবি, তাঁদের ট্রলারে বৈধ কাগজপত্র রয়েছে এবং তাঁরা ৪০ মিটারের কম গভীরতায় মাছ ধরেন না।
আবুল হোসেনের বক্তব্য, ‘ভারতের হাজার হাজার ট্রলার নিয়মিত বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরে। বিদেশিরা ধরলে আমরা কেন পারব না? ভারতীয় ট্রলারগুলো আমাদের সীমানায় ঢুকে মা ইলিশ ধরছে। তারা বন্ধ না হলে আমাদের বন্ধ করে লাভ কী?’
আইনে আছে, বাস্তবে নেই
সামুদ্রিক মৎস্য অধ্যাদেশ ২০২০ অনুযায়ী, লাইসেন্সবিহীন ট্রলার পরিচালনার শাস্তি ছয় মাস থেকে দুই বছর কারাদণ্ড ও ২৫ হাজার টাকা জরিমানা। কিন্তু বাস্তবে আইন প্রয়োগ দুর্বল। চলতি বছর অভিযান চালিয়ে আটটি ট্রলারকে মোট চার লাখ ৮০ হাজার টাকা জরিমানা, পাঁচটি ট্রলার জব্দ এবং আট জেলেকে আটক করা হয়েছে।
কোস্ট গার্ডের তথ্যমতে, গত ২৭ আগস্ট পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ৫৯টি অবৈধ ট্রলার জব্দ ও ২৩ জন জেলেকে আটক করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতে আদায় হয়েছে তিন লাখ ৪০ হাজার টাকা জরিমানা। আর বোটমালিকদের বিরুদ্ধে ৩১টি মামলা দায়ের হয়েছে। বরগুনার পাথরঘাটা ও পটুয়াখালীর মহিপুরের ৭৮ ট্রলারমালিক স্বেচ্ছায় গিয়ার খুলে ফেলেছেন।
‘নীরব মৃত্যু’ সমুদ্রজলে
কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, কুয়াকাটার সমুদ্রজলে চলছে নীরব মৃত্যু। অবৈধ জালে আটকে মারা যাচ্ছে বিরল প্রজাতির কচ্ছপ ও ডলফিন। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত কুয়াকাটা সৈকতে অন্তত ১০টি কচ্ছপ ও ১৮টি ডলফিন মৃত অবস্থায় ভেসে এসেছে। গভীর সমুদ্রে ঠিক কত প্রাণ হারাচ্ছে, তার হিসাব কারো কাছে নেই।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলিশ গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘ট্রলিং ট্রলার সমুদ্রের সব প্রজাতির পোনা, ডিম ও খাবার ধ্বংস করছে। এতে মাছের প্রজনন কমছে। ৪০ মিলিমিটারের নিচের সব জাল ধ্বংস করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারকে ভর্তুকি দিয়ে হলেও নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে। নয়তো শুধু ইলিশ নয়, গোটা মাছের বংশনাশ হবে।’
কলাপাড়া জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, ‘নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ ধরায় কয়েকজন মালিককে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। পাঁচটি ট্রলার জব্দ করে মামলা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘গভীর সমুদ্রে প্রতিদিন আইন লঙ্ঘন করা হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। অবৈধ জালের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু না হলে একদিন এই সাগর শুধু নোনা জলই দেবে, খাবার নয়।’