আইন বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দ্বিতীয় বর্ষের একজন শিক্ষার্থী বলেন, সংবিধান, আইন এসব বিষয়ের ইংরেজি ভাষায় পাঠদান হওয়ায় অনেক সময় তাদের বুঝতে অনেক অসুবিধা হয়। যার জন্য অনেকে ভালো ফলাফল করতে পারে না। আর পুনরায় ভর্তি হতে হয়।
তবে সবকটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে শহর ও গ্রাম থেকে এবং নানা ব্যকগ্রাউন্ড থেকে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হলেও শিক্ষকরা সকলকে একই কাতারে মাপেন এবং একই ভাবে চিন্তা করেন। কিন্তু শহরের একজন শিক্ষার্থী বা ইংরেজি ভার্সন, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের সাথে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের যে পার্থক্য আছে সেটি তারা বুঝতে চান না। এজন্য শিক্ষার্থীরা অনেক সময় তাদের পাঠদান থেকে পড়াশোনা ঠিকঠাক বুঝতে পারেন না। যার জন্য শিক্ষার্থীদের ফলাফল খারাপ হয় এবং তাদের পুনরায় ভর্তি হতে হয়।
প্রথম বর্ষে ও দ্বিতীয় বর্ষে পুনরায় ভর্তি হওয়া এবং বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড্রপআউট হওয়া পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, আমার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের থেকে সাপোর্টিভ ব্যবহার না পাওয়া, শিক্ষকদের সব শিক্ষার্থীকে এক কাতারে মেপে দেখার প্রবণতা এসব জিনিস দায়ী পুনঃভর্তির ক্ষেত্রে। শিক্ষকদের থেকে ঠিকঠাক সহায়তা না পাওয়ায় ফলাফল ভালো হতো না। যার জন্য বারবার পুনর্ভর্তি হওয়া প্রয়োজন হয়েছিল।”
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
এমন পুনঃভর্তির নেতিবাচক সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশীদ বলেন, ‘প্রতিটি বিভাগে পুনর্ভর্তি প্রক্রিয়াকরণে সময় ও সম্পদের অপচয় হয়। চার বছরের কোর্স পাঁচ, ছয় বা সাত বছরে শেষ হচ্ছে। পুনঃভর্তিতে থাকা-খাওয়া, টিউশন ফি ও হল সিটের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়। ধারণক্ষমতার বেশি শিক্ষার্থী থাকলে শ্রেণিকক্ষ, ল্যাব, টয়লেট, ক্যান্টিন ও হলে চাপ বাড়ে এবং শিক্ষার মান কমে। ট্যাবুলেশন শিটে ড্রপআউটের সংখ্যা বাড়লে প্রাতিষ্ঠানিক কমপ্লিশন রেট কমে যায়। এ ধরনের পরিসংখ্যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক সুনামে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘প্রথম বর্ষের ওরিয়েন্টেশনে শিক্ষার্থীদের স্পষ্টভাবে জানাতে হবে — অনুপস্থিতি, ড্রপআউট ও পুনঃভর্তির পরিণতি কী হতে পারে। পিয়ার মেন্টরিং চালু করে প্রতিটি নতুন শিক্ষার্থীকে একজন সিনিয়র শিক্ষার্থীর সঙ্গে যুক্ত করে দিতে হবে, যাতে তারা সহজে প্রশ্ন করতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে অভিযোজিত হতে পারেন।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থী অ্যাডভাইজরি ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করে প্রতি শিক্ষকের অধীনে ৫ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী অ্যাসাইন করে সাপ্তাহিক নির্দিষ্ট সময়ে কাউন্সেলিং বাধ্যতামূলক করতে হবে। এটি শিক্ষকের পদোন্নতি মূল্যায়নেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। গণিত বা অন্যান্য কঠিন বিষয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য সাপ্তাহিক ছোট ওয়ার্কশপ বা সেমিনারের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি বিভাগে বা কেন্দ্রীয়ভাবে একটি ডেডিকেটেড কাউন্সেলিং অফিস রাখতে হবে, যেখানে যে কোনো শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট সময়ে সহায়তা নিতে পারবেন। এলএমএস’র মাধ্যমে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নির্দিষ্ট সীমার নিচে নামলে তাৎক্ষণিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের কাছে স্বয়ংক্রিয় ইমেইল পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পুনঃভর্তি নেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ জরিপ পরিচালনা করতে হবে, যার ফলাফল ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে কাজে আসবে এবং ড্রপআউটের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, ‘প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাদের আমরা অবশ্যই যথাযথ গুরুত্ব দেব এবং বিশেষ যত্ন নেব। আবাসন সুবিধাসহ তাদের যা যা প্রয়োজন, সবকিছু নিশ্চিত করার চেষ্টা করব।’
তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে একটি বিষয় লক্ষণীয় অনেক সময় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা পুনরায় ভর্তি পরীক্ষা দেয়। এর পেছনে একটি প্রধান কারণ হলো, তারা মূলত ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিক্যালে পড়ার লক্ষ্য নিয়ে এখানে ভর্তি থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা দেয় এবং পরবর্তীতে সেই সুযোগ পেলে চলে যায় বা যাওয়ার চেষ্টা করে। এই কারণেই মূলত পুনরায় ভর্তির ঘটনাগুলো ঘটে থাকে।’