সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ অক্টোবর টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। এ উপলক্ষে জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন বলে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম জাপান সফরকে স্বাগত জানিয়ে ঢাকায় জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগ বাসসের এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছে, এ সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারি আরো জোরদার হবে বলে তারা আশা করছে।
জাপান মনে করে, এ সফর আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা এবং অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে। একই সঙ্গে দুই দেশ তাদের অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলো পুনর্ব্যক্ত করতে পারবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা কিভাবে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা করতে পারবে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগ বলেছে, নতুন সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতির কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের উন্নতি হচ্ছে। বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং মানবসম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকেও জাপান বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন। এছাড়া তিনি জাপানের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিনিয়োগের সুযোগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও শিল্প খাতে সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য কর্মসূচিতে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ এবং জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক রয়েছে।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) প্রেসিডেন্ট, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।
সফরের সম্ভাব্য কর্মসূচিতে চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনের পাশাপাশি ইউনিক্লোর সদর দপ্তর এবং নাগোয়া শহরে টয়োটার একটি কারখানা পরিদর্শনও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সফরে নতুন জাপানি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ ত্বরান্বিত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। এ ছাড়া ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সই হওয়া বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (ইপিএ) কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
পররাষ্ট্রসচিব জানিয়েছেন, সফরকালে কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারক সই কিংবা সহযোগিতার বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার অনুযায়ী বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হতে পারে।
জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগ জানিয়েছে, সফরটি বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা দূর করা, ব্যবসায়িক আস্থা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক উদ্যোগগুলোর জন্য শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলার উপায় নিয়ে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করবে।
জাপান একই সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত ও অঙ্গীকারের কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। দেশটির মতে, আলোচনায় অভিন্ন অগ্রাধিকার নির্ধারণের পাশাপাশি সেগুলোর বাস্তব সুফল নিশ্চিত করতে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। চলমান সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়ে জাপান বলেছে, বিদ্যমান উদ্যোগগুলোতে বাস্তব উন্নতি ব্যবসায়িক আস্থা বাড়াতে এবং নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সহায়ক হবে।
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে অন্যতম প্রধান অংশীদার জাপান। দেশটি বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। ঢাকার মেট্রো রেল, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন জাপানের সহযোগিতায় বাস্তবায়িত উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এ সফর ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিকে আরো এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিনিয়োগ, বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও মানবসম্পদ উন্নয়ন দুই দেশের অভিন্ন অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে থাকবে।