ঢাকা, কথাপ্রকাশ, জুলাই ২০২৫, পৃষ্ঠা ৫১২। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হচ্ছে জনগণ কর্তৃক প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত সংসদ তথা পার্লামেন্ট। সংসদীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোয় নির্বাহীর কর্তৃত্ব সংসদ থেকে উৎসারিত হয় এবং এ প্রতিষ্ঠানের কাছেই নির্বাহীর দায়িত্বশীলতার প্রমাণ দিতে হয়। এরূপ জবাবদিহি অন্যান্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় কাঠামোকে এক অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে।
এভাবে এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সংসদ জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রকাশ ঘটায় এবং জনপ্রতিনিধিত্বের প্রতীক হিসেবে আইন প্রণয়ন, নির্বাহীর কর্মকাণ্ডের তদারকি এবং সরকারের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার মুখ্য দায়িত্ব পালন করে। সরকারের বৈধতা দান, বাজেট অনুমোদনসহ জনদাবির প্রকাশ ও সামাজিকীকরণের বাহক হিসেবেও সংসদ গুরুত্বপূর্ণ।ঊনবিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাজ্যে ‘সংসদের-সার্বভৌমত্বের ধারণা ও প্রভাব থাকলেও পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নির্বাহী ও সংসদের মধ্যে অসম সম্পর্ক বিরাজমান রয়েছে। বর্তমানকালে কঠোর দলীয় শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক আনুগত্য ও আমলাতন্ত্রের অতিবিকাশ সংসদের কর্তৃত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে এবং প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নির্বাহীর ক্ষমতা ও এর নিরঙ্কুশ প্রাধান্য বিস্তার অব্যাহত রয়েছে বলা যায়।ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে বাংলাদেশ সংসদীয় কাঠামোর সঙ্গে পরিচিতি থাকলেও স্বাধীনতা উত্তর-কাল থেকে অদ্যাবধি সুষ্ঠু সংসদীয় কার্যক্রম এবং কার্যকরী কাঠামো গঠনে সীমাবদ্ধতা থাকায় যথাযথভাবে নির্বাহীর দায়িত্বশীলতা অইনসহ জাতীয় সংসদের প্রাতিষ্ঠানিকায়ন সমস্যাসংকুল হয়েছে। বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র এবং জাতীয় সংসদের ওপর গবেষণাধর্মী, মূল্যায়নজনিত বিভিন্ন একাডেমিক গ্রন্থ ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। কে এম মহিউদ্দিন রচিত আলোচ্য গ্রন্থটি এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য এবং মূল্যবান সংযোজন।লেখক তার গবেষণাকর্মটিকে সর্বমোট চৌদ্দটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করে সংশ্লিষ্ট বিবরণ, ব্যাখ্যা, অনুসন্ধান, উদাহরণ, মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ উপস্থাপনে প্রয়াসী হয়েছেন।
বইটির প্রথম অধ্যায়ে সংসদীয় কাঠামো, কর্মপদ্ধতি এবং তাত্ত্বিক প্রসঙ্গ আলোচনা করা হয়েছে যাতে সাধারণভাবে সংসদের ধারণাগত ঐতিহাসিক বিবরণ ও সার্বভৌমত্ব, ক্ষমতা হ্রাস এবং কাঠামোভিত্তিক ভিন্নতা বিভিন্ন দৃষ্টান্তসহ তুলে ধরা হয়েছে। ২য় অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে বাংলাদেশে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সংসদের উৎপত্তি, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে সংসদীয়-কাঠামো গঠন ও সংশ্লিষ্ট আইন-কানুন, বঙ্গীয় আইন সভা, যুক্ত পাকিস্তানের আইন সভাসমূহ এবং স্বাধীনতাউত্তর কালের জাতীয় সংসদের গঠন ও কার্যক্রম। এ দেশে নির্বাচন পদ্ধতি এবং প্রথম থেকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসমূহের বিস্তারিত বর্ণনা তথ্যসহ উপস্থাপিত হয়েছে ৩য় অধ্যায়ে। এভাবে ৪র্থ অধ্যায়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদে অবস্থান চিত্রিত হয়েছে। সংসদ ভবনের স্থাপত্যকে রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা এ গ্রন্থের এক অভিনবত্ব, যা তুলে ধরা হয়েছে ৫ম অধ্যায়ে।
আলোচ্য বইয়ের পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে বিস্তারিতভাবে চিত্রিত হয়েছে এ দেশের সংসদীয় প্রক্রিয়া, আইন প্রণয়ন ও কার্যক্রম পদ্ধতি, সংসদীয় তদারকি, সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থার চালচিত্র, জনগণ ও সংসদ সদস্যগণের পারস্পরিক সম্পর্ক, সংসদীয় বিশেষ—অধিকার এবং দায়মুক্তির বিষয়াদি এবং সংসদীয় সচিবালয়ের কর্মক্ষেত্র। গ্রন্থের সমাপনী অধ্যায়ে লেখক সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি বনাম এর বাস্তব দিক তুলে ধরেছেন যাতে উল্লেখ করা হয়েছে সংসদীয় কাঠামোসহ আমলাতন্ত্র ও সুশীল সমাজের ভূমিকা এবং এর প্রেক্ষাপট রাজনৈতিক সমঝোতার সমস্যা ও সম্ভাবনার বিভিন্ন দিক।উপরের অধ্যায়-বিন্যাস থেকে প্রতীয়মান হয় যে গ্রন্থ লেখকের বিষয়বস্তু নির্মাণ ও ক্ষেত্র নির্ধারণ এবং বিশ্লেষণে অন্যান্য প্রকাশনার তুলনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। গ্রন্থটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো সংসদীয় তুলনামূলক আলোচনায় অন্যান্য প্রাসঙ্গিক দেশগুলোতে প্রচলিত কাঠামো ও চর্চার অবতারণা। বইটিতে সংসদীয় কার্যক্রমের প্রায় সব ক্ষেত্রই আলোচিত হয়েছে যাকে সর্বঅন্তর্ভুক্তিমূলক বলে অভিহিত করা যায়। বইটির ইতিবাচক দিক গুলো হচ্ছে বর্ণিত বিষয়বস্তুর সামগ্রিকতা, গভীর ও তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সম্পর্কিত বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং সংকট উত্তরণের উপায় নির্ধারণ।
তবে এর সমালোচনার দিক হলো কিছু ক্ষেত্রে বর্ণনা দান প্রাধান্য পেয়েছে এবং যথার্থ বিশ্লেষণ উপেক্ষিত হয়েছে। যেমন, এ দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার নিড়িখে উদ্ভূত মহু মাত্রিক উপাদান এবং সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জসমূহ যা সংসদীয় প্রক্রিয়ার প্রভাবক সেসবের বিশ্লেষণ নি:সন্দেহে গুরুত্ববাহী। উল্লেখ্য যে আলোচ্য বইটি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের কাঠামো, কর্মসম্পাদন ও বাস্তব অনুশীলন নিয়ে একটি ব্যাপক গবেষণাভিত্তিক রচনা। যথাযথ তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ও প্রমাণনির্ভর তথ্যের সমন্বয় বইটিকে সমৃদ্ধ করেছে। এর পরিশিষ্ট এবং গ্রন্থপুঞ্জীও উল্লেখযোগ্য। এটি সংশ্লিষ্ট গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং অবশ্য পাঠ্য। সংসদ বিষয়ক গভীরতর গবেষণায় বইটির অবদান অনস্বীকার্য। এর বহুল প্রচার কাম্য।
ড. আল মাসুদ হাসানউজ্জামান
অধ্যাপক (অব.)
সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ..