শুক্রবার রাত ১১টা ৪০ মিনিট। চট্টগ্রামের মিরসরাই থানার সামনে একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অ্যাম্বুলেন্স। ভেতরে ১০ বছরের শিশু আরাফাত হোসেনের নিথর দেহ। বাইরে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মামা ফিরোজ আহাম্মদ।
শুক্রবার রাত ১১টা ৪০ মিনিট। চট্টগ্রামের মিরসরাই থানার সামনে একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অ্যাম্বুলেন্স। ভেতরে ১০ বছরের শিশু আরাফাত হোসেনের নিথর দেহ। বাইরে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মামা ফিরোজ আহাম্মদ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, মিরসরাই সদর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মান্দারবাড়িয়া গ্রামে মাওলানা অলি আহাম্মদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে শুক্রবার দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে পানিতে ডুবে আরাফাতের মৃত্যু হয়। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল ঘটনাটির। কিন্তু এর পরই মরদেহ ঘিরে শুরু হয় এক অমানবিক নাটকীয়তা।মিরসরাই থানার ওসি ফরিদা ইয়াসমিন নিশ্চিত করেন, কাতারে অবস্থানরত আরাফাতের পিতা আকতার হোসেন ফোন করে মরদেহ ময়নাতদন্তের দাবি জানান। তাঁর অভিযোগ, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়; বরং আরাফাতের মামা ফিরোজ আহাম্মদ তাকে হত্যা করেছেন। একই দাবিতে থানায় হাজির হন শিশুটির চাচা মাঈন উদ্দিন।
এতে প্রশ্ন উঠছে, যে বাবা গত ছয় বছরে একবারও সন্তানের খোঁজ নেননি, মৃত্যুর পর তাঁর আগ্রহ এত প্রবল কেন? আর যিনি বাবা-মায়ের আদরে কোলেপিঠে মানুষ করেছেন, সেই মামাকে ফাঁসানোর মরিয়া চেষ্টাই বা কেন?
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য।২০২০ সালের ৫ এপ্রিল আরাফাতের মা কুলসুমা আক্তার মুন্নী শ্বশুরবাড়িতে নিহত হন। সে সময় ঘটনাটিকে আত্মহত্যাহিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তবে মুন্নীকে হত্যা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করে আসছিলেন তাঁর স্বজনরা। ওই ঘটনায় ফিরোজ আহাম্মদ আরাফাতের বাবাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মুন্নী হত্যাকাণ্ডের বিচার আজও হয়নি।মামলাটি তদন্তের জালে আটকে আছে। আর সেই মামলার বাদী হওয়ায় ফিরোজ আহাম্মদের ওপর দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষুব্ধ ছিলেন আকতার হোসেন। এলাকাবাসীর দাবি, এই প্রেক্ষাপটেই আরাফাতের মৃত্যুকে পুরনো মামলার প্রতিশোধ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা চলছে। রাতভর থানার সামনে মরদেহ পড়ে থাকার দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত তাঁরা।
মধ্যরাতে থানার সামনে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন ফিরোজ আহাম্মদ। এই প্রতিবেদকের কাছে প্রশ্ন করেন, যে শিশু জীবিত অবস্থায় বাবার আদর পায়নি, মৃত্যুর পরও কি তাকে শান্তিতে কবরে যেতে দেওয়া হবে না? কী দোষ করেছিল ছোট্ট শিশুটি, যে তাকে ময়নাতদন্তের নামে ক্ষতবিক্ষত করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ‘এমন পাষণ্ড পিতা যেন আর কোনো সন্তানের জীবনে না আসে।’
ফিরোজ বলেন, ছয় বছর আগে এই ছোট্ট আরাফাতের সামনেই তার মাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় আরাফাত আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছে। আজও ওই হত্যার বিচার হয়নি।
এদিকে মৃত্যুর প্রায় ৩১ ঘণ্টা পর গতকাল শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় পশ্চিম অলিনগর মহাজনপাড়া কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে শায়িত করা হয় আরাফাতকে। এর আগে বিকেল ৩টায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।
আরাফাতের মহদেহের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেন মিরসরাই থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আজিজুল হাকিম। তিনি বলেন, ‘খুব সতর্কভাবে আরাফাতের মরদেহ পরীক্ষা করেছি। শরীরের কোথাও কোনো ধরনের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে মারা গেছে বলেই মনে হয়েছে।’
এই অবস্থায় আরাফাতের মামা ফিরোজসহ এলাকাবাসী ছোট্ট শিশুটিকে ময়নাতদন্তের মাধ্যমে ক্ষতবিক্ষত না করার অনুরোধ জানালেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। রাতভর থানার সামনেই রাখা হয় তার মরদেহ।
ময়নাতদন্তের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে ওসি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, একদিকে নিহতের বাবা হত্যার অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রিপোর্টে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছিল। এ জন্য অমানবিক মনে হলেও ছোট্ট শিশুটির ময়নাতদন্ত করা বাধ্যতামূলক মনে হয়েছে।
এ বিষয়ে কথা বলতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে জানা যায়, আরাফাতের রিপোর্ট তৈরি করেন দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. মাহমুদা আক্তার। রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয়, ‘ডিউ টু ড্রনিং’ বা ‘পানিতে ডুবে মৃত্যু’। তবে এর পাশে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন রাখা হয়।
প্রশ্নবোধক চিহ্ন ব্যবহারের কারণ জানতে চাইলে রাতে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. এস এম হামিদ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, এভাবে প্রশ্নবোধক চিহ্নটি ব্যবহার করা উচিত হয়নি, যার কারণে ঘটনাটি ময়নাতদন্ত পর্যন্ত গড়াল। তিনি জানান, ডিউ টু ড্রনিং বলতে সাধারণত কোনো ব্যক্তি বা প্রাণীর পানিতে তলিয়ে গিয়ে শ্বাসরোধ হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা বোঝায়।
মায়ের মৃত্যুর পর মামা ছিলেন সবকিছু
উপজেলার ১ নম্বর করেরহাট ইউনিয়নে বিএমকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র ছিল আরাফাত হোসেন। মাত্র চার বছর বয়সে মাকে হারিয়ে হয়ে পড়ে এতিম। আশ্রয় হয় নানাবাড়িতে। সেখানে মামা ফিরোজই হয়ে ওঠেন তার বাবা এবং মায়ের বিকল্প। কোথাও ঘুরতে গেলে একসঙ্গে, খেতে বসলেও একসঙ্গে। ছোট ছোট খুশির মুহূর্তগুলো ভাগ্নের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে মায়ের অভাব কিছুটা হলেও পূরণের চেষ্টা করতেন।
গত বৃহস্পতিবার মান্দারবাড়িয়া গ্রামে আত্মীয়ের বিয়ে উপলক্ষে আরাফাতকে নিয়ে বেড়াতে যান ফিরোজ। পরদিন শুক্রবার সকাল ১১টায় নিখোঁজ হয় আরাফাত। প্রায় এক ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর পার্শ্ববর্তী পুকুর থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। আরাফাতের মৃত্যুতে পুরো উপজেলায় শোক নেমে এসেছে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ফিরোজকে সান্ত্বনা দিতে থানায় হাজির হন অনেকে।
স্থানীয়রা জানিয়েছে, এতিম আরাফাতকে নিজের সন্তানের মতো মানুষ করছিলেন মামা ফিরোজ। স্কুলে ভর্তি, চিকিৎসা, দৈনন্দিন খরচ থেকে শুরু করে সবই বহন করেছেন তিনি। বিপরীতে, প্রবাসে থাকা পিতা আকতার হোসেন প্রায় ছয় বছরে একবারও ছেলের খোঁজ নেননি। বছর দুয়েক আগে দেশে এসে দ্বিতীয় বিয়ে করলেও ছেলের খোঁজ নেননি। তবুও মৃত্যুর পর তাঁর দাবি, এই মৃত্যু স্বাভাবিক নয়।