ভালো মন্দ মিলিয়েই কাটছে। যদিও আমি সব পরিস্থিতিতেই ভালো থাকার চেষ্টা করি। নিজেকে বোঝাই, আমি যেমন আছি, তেমন থাকাটাও হয়তো অনেকের কাছে স্বপ্নের।ভীষণ আরাধ্য। সুতরাং সবার আগে সন্তুষ্ট হওয়াটা জরুরী।
খুব একটা না। হয়তো আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘরকুনো হয়ে গেছি। চারপাশ থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেছি।
আপনার প্রশ্নটাকে যদি আমি খানিক অন্যভাবে দেখি, তাহলে বিষয়টা ইন্টারেস্টিংই। কারণ, যে অন্ধ সে কিন্তু নিজের মতো করে একটা জগৎ তৈরি করে। নিজের উপলব্ধি, অভিজ্ঞতা ও কল্পনার সংমিশ্রণে। একইভাবে যিনি কথা বলতে পারেন না, তিনিও নিজের উপলব্ধি, অভিজ্ঞতা ও ভাবনার সংমিশ্রণে একটা ভাষা তৈরি করে। যে নড়তে চড়তে পারে না, সেও কিন্তু তার ইশারায় অন্যের সঙ্গে সংযুক্ত হতে চায়। এদের প্রক্রিয়াগুলোই মূলত যোগাযোগের উপায়।
এখন পৃথিবী যদি আমরা এভাবে দেখি যে পৃথিবীতে আমরা যা করি, তার পুরোটাই মূলত সংযোগ তৈরির চেষ্টা, তাহলে কি সেটা ভুল? ভার্বাল ল্যাঙ্গুয়েজ, ভিজ্যুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ, বা টেলিপ্যাথি বা এই যে এতো এতো প্রযুক্তি, মহাকাশে স্যাটেলাইট স্থাপন, প্রত্নতাত্ত্বিকদের ইতিহাস অনুসন্ধান কিংবা একজন ক্ষুধার্তের খিদের যন্ত্রণা বোঝা, রোগীর ব্যথার যন্ত্রণা বোঝা, শীতার্তের শীতের কষ্ট, প্রেমিক প্রেমিকের পরস্পরের অনুভূতি, সাগরের তলদেশ থেকে মহাকাশ এর সবই আসলে যোগাযোগের চেষ্টা। আর তার জন্য ভিন্ন ভিন্ন ভাষা তৈরি। ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যম বা উপায়। অন্যের অনুভূতি, অজানাকে জানতে, উপভোগ বা অনুভব করতে মানুষ যোগাযোগের এতো এতো উপায় তৈরি করছে। আমার মনে হয়, শব্দ যেমন ভাষা, তেমনি নৈঃশব্দ্যও ভাষা। পৃথিবীর সকল কিছুই আদতে ভাষা। ওই যে পাতার শব্দ, বৃষ্টির শব্দ, মেঘের গর্জন, পাখির ডাক, এমনকি হাড়ি পাতিল মাজার শব্দও ভাষা। দেখবেন, এর প্রতিটিই কোনো না কোনো ভাবে অনুভূতি তৈরি করে। অর্থাৎ যোগাযোগ তৈরি করে। তো আমি একটু একা থাকতে পছন্দ করি বলেই হয়তো ভাবি যে একা থেকেও কীভাবে নানাভাবে সংযোগ স্থাপন করা যায়। সেটা কল্পনায় হতে পারে। নৈঃশব্দ্যে হতে পারে। ইশারায় বা অনুভূতিতেও হতে পারে। এ কারণে হয়তো বিভিন্ন চরিত্রে এই ব্যাপারটি ভিন্ন ভিন্নভাবে এসেছে।
কোনো চরিত্র কি কখনো আপনাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে—যেটাকে লিখতে গিয়ে নিজেকেই চিনে ফেলেছেন?
ভয় পাইয়ে দেয়নি, তবে অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছি নিজের সঙ্গে। মনে হয়েছে নিজেকেই লিখছি। যেমন ‘তুমি সন্ধ্যা অলকানন্দা’ উপন্যাসের ধ্রুব চরিত্র এবং ‘শঙ্খচূড়ে’র অরুণাদিত্য চরিত্রটি। মনে হয়েছে সম্ভবত আমারই প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে মানুষ কথা বলছে বেশি, কিন্তু বুঝছে কম—এই বাস্তবতা আপনার লেখায় প্রভাব ফেলে?
এটা একটা খুব ভালো জিজ্ঞাসা। হ্যাঁ, আজকাল মনে হয় মানুষ খুব অস্থির হয়ে উঠেছে। যেন স্থির হওয়ার অবকাশ নেই তাদের। আসলে চারপাশে এতো এতো অপশন যে দ্রুত শিফট হয়ে যাচ্ছে মনোযোগ। শোনার চেয়েও সবাই বলতে চায়। এখন একটা ঘরের দশজন মানুষ যখন একইসঙ্গে বলতে চায়, তখন আসলে কেউ কারো কথা শুনতে পায় না। আর শুনতে না পেলে বুঝবে কী করে? এজন্য একজন একজন করে বলতে হয়। মানছি যে আমাদের সবারই বলার মতো অসংখ্য কথা, অনুভূতি, গল্প থাকে। কিন্তু এমনওতো হয় যে যারা বলছেন, তারাও কেউ কেউ হয়তো আমার অনুভূতিটাই প্রকাশ করছেন। সুতরাং শুনলে সেটি হয়তো উপলব্ধি করা যেত। কিন্তু সকলে একসঙ্গে বললে সেই শোনাটাও যেমন হয় না। উপলব্ধিটাও না।
কখনো কি মনে হয়েছে, আপনি আসলে নিজের না বলা কথাগুলোই চরিত্রদের দিয়ে বলিয়ে নিচ্ছেন?
হ্যাঁ। এটা সবসময়ই মনে হয়।
আপনি কি বিশ্বাস করেন—সব মানুষই একদিন না একদিন ভেঙে পড়ে, শুধু ভাঙার ভাষাটা আলাদা? এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?
একদম তাই। মানুষ প্রবল অনুভূতি তাড়িত প্রাণী। আর অনুভূতি নানানরকম হয়। তাতে প্রচন্ড ঋজুতা যেমন থাকে, ভঙ্গুরতাও।
আপনার কোনো লেখাকে পাঠক যখন বলে, ‘এই গল্পটা আমার জীবন’— তখন আপনার ভেতরে কী হয়?
ভীষণ তৃপ্তির অনুভূতি হয়। কারণ, লেখকতো তার লেখার মধ্য দিয়ে মানুষের অনুভূতির কুয়োয় থাকা বিন্দু বিন্দু জলও নিঙড়ে নিয়ে আসেন। আর সেটা কিন্তু খুব সহজ কাজ নয়। ফলে কেউ যখন বলেন যে তার অনুভূতি ভীষণ গভীর ও সুক্ষ্মভাবে প্রতিবিম্বিত হয়েছে, তখন মনে হয় কাজটা ঠিকঠাক করতে পেরেছি।
শুনেছি এবারের বই মেলায় আপনার নতুন দুইটা বই আসছে। সেগুলো নিয়ে কিছু বলুন।
একটির নাম ঠিক হয়েছে, নীলকণ্ঠী। লেখা প্রায় শেষের দিকে। আরেকটি উপন্যাস লেখা ছিল অনেক আগে, আড়াল নামে। সেই উপন্যাসটি যখন লিখেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল সেটি আরও বিস্তৃতি দাবী করে। হয়তো সেটিকে বই আকারে প্রকাশ করার আগে আরও বিস্তৃত করব।
আজ যদি ২০ বছর বয়সী সাদাত হোসাইনের সঙ্গে দেখা হয়—আপনি তাকে কী বলতে চাইতেন?
আরও আগে লেখালেখিটা শুরু করতে চাইতাম। আসলে নিজের ভেতরে যে শক্তিটা আমাদের থাকে, তা বেশিরভাগ সময়ই আমরা আবিষ্কার করতে পারি না। বুঝতে পারি না। এজন্য অনেকক্ষেত্রে হয়তো আমাদের একটা জীবনই কেটে যায় নিজের শক্তি বা সক্ষমতার জায়গাটা বুঝতে। আবার কখনো কখনো বিলম্ব হয়। লেখালেখির ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি আমার ক্ষেত্রে ঘটেছে। মনে হয়েছে, আমি হয়তো আরও আগে শুরু করতে পারতাম। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের নানাবিধ পারস্পেক্টিভ বদলায়। দর্শন, উপলব্ধি, বোঝাপড়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা পরিণত হয় বলে অনেকেই বলেন বা মনে করেন। কিন্তু আমার মনে হয়, প্রত্যেক বয়সেরই আলাদা বিশেষত্ব আছে। দৃষ্টিভঙ্গি আছে। একটা শিশু কীভাবে পৃথিবীটা দেখছে, ফীল করছে তা একজন কিশোর, একজন বয়স্কের জীবন দর্শনের সাপেক্ষে অকিঞ্চিৎকর নয় মোটেই। বরং ওটাই জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। এই কারণে সেই কুড়ি, আঠারো বছর বয়সের নানাবিধ অনুভূতি, পারসেপশন, পারস্পেক্টিভ ঠিক তখনকার বয়সে লেখা বা প্রকাশ না করার আক্ষেপ খানিক হয়।
আপনি কি মনে করেন, আজকের তরুণ প্রজন্ম আগের চেয়ে বেশি একা? সেক্ষেত্রে মূল কারণ কী?
হ্যাঁ। এটা মনে হয়। এর অসংখ্য কারণ আছে। মূল যেটা মনে হয়, সেটা হচ্ছে, আপনার সঙ্গী যত বেশি থাকবে, আপনার একাকীত্ব, নিঃসঙ্গতাও তত বেশি হবে। সঙ্গী যত কম হবে, আপনার নিঃসঙ্গতাও তত কম হবে। একটু কি অদ্ভুত উত্তরটা? আচ্ছা ব্যখ্যা করছি। ধরুন, যখন দুজন মানুষ একসঙ্গে থাকে, তখন তারা পরস্পরের সবচেয়ে ভালো, সবচেয়ে নিবিড়, সবচেয়ে প্রগাঢ় বন্ধু হয়। তাদের পরস্পরের সঙ্গ হয় সবচেয়ে ঘনিষ্ট, একাত্ম, একান্ত। তারা দুজন পরস্পরের গভীর অনুভূতিগুলো অনুভব করতে পারে। শেয়ার করতে পারে। নিঃসঙ্গতা কাটাতে পারে। কিন্তু তিনজন হলে পারস্পরিক ঘনিষ্টতা, একাত্মতা দুজনের তুলনায় বেশ খানিকটা কম হয়। চারজন হলে আরও খানিক কম। অর্থ্যাৎ সঙ্গীর সংখ্যা যত বাড়তে থাকে মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ, নিবিষ্টতা, নিবিড়তা তত কমতে থাকে।
একটা জনসভায় যদি ১০ লাখ লোক থাকে, তাতে কিন্তু লোক সংখ্যা অনেক। কিন্তু তারা পরস্পরের সঙ্গী নয়। একান্ত সঙ্গও নয়। বরং বিচ্ছিন্ন। অসংখ্য মানুষের ভিড়েও প্রত্যেকেই একা। তাদের একজনের দুঃখ, কষ্ট, একাকীত্ব তার গা ঘেঁষে লেপ্টে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটারও রয়ে যায় অজানা। তারা কেউ কাউকে চেনে না, জানে না। অথচ দুজন মানুষ একসঙ্গে থাকলে তারা অপরিচিত হলেও দেখবেন কুশল বিনিময় হয়, কথা হয়, গল্প হয়। চা খেতে অফার করে। ঠিকানা জিজ্ঞেস করে। প্রফেশন, পরিবারের খবর জানতে চায়। আড্ডা হয়। তাই না? অর্থাৎ ওই অচেনা দুজন মানুষও পরস্পরের চেনা, জানা, ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। দশজন হলে কিন্তু সেটা হয় না। এজজন্যই যত কম সঙ্গী, তত পরস্পরের সবচেয়ে গভীর, গাঢ় সঙ্গ। তো এখন, এইসময়ে দেখবেন মানুষের সঙ্গী অনেক। সেটা কেবল মানুষের সাপেক্ষে বা রিয়েল লাইফেই নয়, ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডেও। আবার কেবল মানুষই মানুষের সঙ্গী নয়, যন্ত্র বা ডিভাইসও মানুষের সঙ্গী বা সঙ্গ। সেই যন্ত্রের ভেতর থাকা অসংখ্য এলিমেন্টও সঙ্গী। এই যে চারপাশে এতো রকমের সঙ্গ ও সঙ্গী, এগুলো মানুষকে মূলত ভেতরে ভেতরে তার নিজের অজান্তেই নিঃসঙ্গ করে দিচ্ছে। সে সবার সঙ্গেই থাকছে, অথচ কারো সঙ্গেই গভীরভাবে থাকছে না। ফলে সে যতটা অগভীর আনন্দ নিয়ে হাসছে, তারচেয়ে অনেক বেশি গভীর দুঃখ নিয়ে কাঁদছে। কারণ, তার ওই আনন্দটা খুব সামান্য এক মুহূর্তের এবং তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্রেফ প্রদর্শনের নিমিত্তে। এ কারণেই আমার মনে হয় সম্পর্ক যত বিস্তৃত হয়, অনুভূতি তত অগভীর হয়। আর অনুভূতি যত অগভীর হয়, মানুষ তত নিঃসঙ্গ হয়।
নতুন লেখকদের জন্য সবচেয়ে কঠিন সত্যটা কী, যেটা কেউ আগে বলে না?
পৃথিবীতে নতুন কোনো কথা নেই। গল্পও না। সবই আগে বলা হয়ে গেছে। হয়তো ভিন্নভাবে, ভিন্ন উপস্থাপনায়। ফলে নতুন লেখকদের জন্য নতুনভাবে কিছু বলার নেই। শুধু এটুকুই বলব, ‘এইসময়ে প্রচুর নতুন লেখকরা লিখছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার লেখা থেকেই অসংখ্য উপন্যাস, গল্পের বই প্রকাশ হচ্ছে। বাচ্চা বাচ্চা ছেলে-মেয়েরা লিখছে। বিশেষ করে মেয়েদের সংখ্যা অনেক। এটি একদিক দিয়ে ভালো যে ছেলেমেয়েরা সৃষ্টিশীল কাজের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছে। আমি এটিকে এপ্রিশিয়েট করি। কিন্তু আবার একইসঙ্গে এটিও অনুভব করি যে এদের একটা বড় অংশই কিছু না পড়েই লিখছে। একদম কিছু না পড়েই। এটি একটা খারাপ প্র্যাকটিস। লেখক হবার আগে ভালো পাঠক হওয়াটা জরুরী। না হলে লেখক সত্তা পরিস্ফুটিত হয় না। অংকুরেই ঝরে যায়। এমনকি তুমুল সম্ভাবনা থাকলেও। সো, এটা একটা কঠিন সত্য। এই সত্যটা বোঝা জরুরি।
যদি পাঠকের কাছে এক লাইনের একটা কথা রেখে যেতে চান—সেটা কী হবে?
নিভে গেলে আলো, জ্বেলে দিও মন।