প্রথম দফার ১৫২ আসনে গ্রামীণ ভোটার ৮১ শতাংশ, যেখানে মুসলিম ২৯ শতাংশ, তফসিলি জাতি ২৪ শতাংশ এবং উপজাতি অংশ নিয়েছে ৯ শতাংশ। অন্যদিকে দ্বিতীয় দফার ১৪২ আসনে গ্রামীণ ভোটার মাত্র ৫৩ শতাংশ হলেও শহরে হার বেশি ছিল। সেখানে আবার মুসলিম ২৫ শতাংশ, তফসিলি জাতি ২৩ শতাংশ এবং উপজাতি ২.৫ শতাংশ।
এই জনসংখ্যার আনুপাতিক পরিবর্তন প্রধান জোড়াফুল ও গেরুয়া ভোটের ফলে প্রভাব কতটা পড়ে সেটাই দেখার বিষয়। একই সঙ্গে বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ-হুমায়ুনের দলও ভোটের মাঠে কতটা প্রভাব রাখে।
ভোটার টানতে যেসবকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে বিজেপির
রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি বিরোধী দল হিসেবে ক্ষমতাসীন জোড়া ফুলের বিরুদ্ধে বেশ কিছু ইস্যু নিয়ে ভোটাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। যেখানে ছিল ১৫ বছর ক্ষমতার একচ্ছত্র ব্যবহার ভোটের পালে হাওয়া জুগিয়েছে। এ ছাড়া আরজি কর, কসবাল কলেজের মতো স্পর্শকাতর ঘটনা নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে জনরোষ ব্যাপক চাপে রাখে। একই সঙ্গে তৃণমূলের বিরুদ্ধে অল্প অল্প দুর্নীতির ইস্যু, ২৬ হাজার চাকরি বাতিল মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ জুগিয়েছে। এতেই শহরে শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা তৃণমূল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে কাজ করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে আলু চাষিদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। রাজ্যের ২৬টি আসনের ‘আলু গোলায়’ ২০২১ সালে তৃণমূল ১৮টি এবং বিজেপি ৮টি আসনে এগিয়ে থাকলেও, ২০২৪-এর লোকসভায় তৃণমূল কমে ১৬ এবং বিজেপি বেড়ে ১০-এ দাঁড়িয়েছে। এটি বিজেপির জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত।
এ ছাড়া মুর্শিদাবাদের সহিংসতা, ওয়াকফ ইস্যু এবং বেলডাঙার ঘটনায় নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটাতে পারে। যা বিজেপির ভোট ব্যাংকে শক্ত করবে বলে মনে করেন অনেকে।
যেসব জায়গায় ক্ষমতাসীন তৃণমূলের অ্যাডভান্টেজ
একটানা ১৫ বছর ক্ষমতার জেরে কিছু নেতিবাচক প্রচার বাড়লেও তৃণমূল কংগ্রেসের বেশ কিছু ভালো কাজও ছিল। যা এই নির্বাচনে দলটিকে বড় অ্যাডভান্টেজ দেবে বলে মত দিয়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তৃণমূলে জোড়াফুলের সাংগঠনিক দৃঢ়তা সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, যা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভোটারদের ভোট ঘরে রাখতে সাহায্য করে।
অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা নারীদের ভোট তৃণমূলের পক্ষে ধরে রাখার পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ। এ ছাড়া কন্যাশ্রী, রূপশ্রীর মতো একের পর এক জনমুখী প্রকল্প তো রয়েছে।
অনেকেই বলছেন, এবার ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধনে’র (এসআইআর) প্রভাব রাজ্যের মুসলিম ভোট আরো বেশি করে তৃণমূলের পক্ষে গিয়েছে। পাশাপাশি, এই এসআইআরের তালিকা থেকে বাদ পড়া মতুয়া সম্প্রদায়ের অসন্তোষও ক্ষমতাসীনদের পক্ষে গিয়েছে। অন্যদিকে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের হিসাব বলছে জঙ্গলমহলে তৃণমূল তাদের হারানো জমি অনেকটাই ফিরে পেয়েছে, যা এবারের ভোটে তাদের বাড়তি অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।
এবার ভোটে নির্ণায়ক কারা?
তৃণমূল ও বিজেপির সরাসরি লড়াইয়ের বাইরে যেসব ইস্যু সরাসরি প্রভাব ফেলবে তার মধ্যে এসআইআর থেকে ২৭ লাখ মানুষের নাম বাদ যাওয়ার ঘটনা। যা ভোটের মাঠে বড় নির্ণায়ক হয়ে দাড়াবে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের ক্ষোভের ছাপও ভোটের বাক্সে বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে মহিলাদের মন জয় করতে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পাল্টা হিসেবে বিজেপির ‘মাসে ৩ হাজার টাকা’ দেওয়ার আশ্বাস কতটা প্রভাব ফেলবে, তা দেখার বিষয়। পাশাপাশি বেকার ভাতা, দ্রুত নিয়োগের প্রতিশ্রুতি, ডিএ-র মতো বিষয়গুলি রাজ্যের তরুণ প্রজন্ম এবং চাকরিপ্রার্থী, সরকারি কর্মীদের অনেকাংশেই প্রভাবিত করবে।
পাশাপাশি এবারের ভোটে তৃতীয় শক্তির ভূমিকাও ভালোয় থাকবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বাম, আইএসএফ এবং কংগ্রেসের জোটবদ্ধ বা আলাদা লড়াই কতটা ভোট নিজেদের দিকে টানতে পারবে, তার ওপর অনেক আসনের জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে। অনেক আসনেই প্রতিষ্ঠান বিরোধী ভোটে ভাগ বসালে বিজেপির ক্ষতি, আবার সংখ্যালঘু বা টেনে নিলে তৃণমূলের ক্ষতি।