লক্ষ্মীপুর: লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চাঁদখালী এ.রব (আবদুর রব) বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি আদালতে মামলা করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। আবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকও মামলা করেছেন সভাপতির বিরুদ্ধে। একই সাথে সভাপতির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট বোর্ডকেও লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।
এসব ঘটনায় বিদ্যালয় এবং এলাকাজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সভাপতি এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমন টানাপোড়েনে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশ।
জানা গেছে, বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কামাল হোসেন সভাপতি মোরশেদ আলমের কাছ থেকে কাছে ১০ লাখ টাকা ধার নিয়ে পরিশোধ না করার অভিযোগ তোলেন। পাওনা আদায়ে গত ২৮ জুলাই সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্টেট আমলী অঞ্চল লক্ষ্মীপুর সদর আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন মোরশেদ আলম। প্রমান হিসেবে একশ টাকার তিনটি স্ট্যাম্পের লেনদেনর চুক্তিপত্র হিসেবে দেখানো হয়। তবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কামাল হোসেন দাবি করেছেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব দেওয়ার সময় সভাপতি মোরশেদ আলম একশ টাকার তিনটি অলিখিত স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়েছেন। সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় এখন ওই স্ট্যাম্পগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। স্ট্যাম্প উদ্ধারের জন্য গত ২৭ জুলাই তিনি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। বিষয়টি মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডকেও লিখিতভাবে অবহিত করেন। সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা অভিযোগটি তদন্ত করছেন৷
যদিও সভাপতি মোরশেদ আলম দাবি করেছেন, টাকা ধার নিয়ে পরিশোধ বা করায় তিনি মামলা করতে বাধ্য হয়েছেন। আর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কামাল হোসেন দাবি করেন, সভাপতি বিদ্যালয়ের ফাণ্ড থেকে মোটা অংকের টাকা তুলতে না পেরে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে স্ট্যাম্পগুলো দিয়ে মামলা করেছেন৷
শিক্ষক কামাল হোসেন জানান, ২০১৩ সালে তিনি ওই বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। অসুস্থতার কারণে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহবুবুর রহমানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে সভাপতি মোরশেদ আলম ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর তাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেন৷ এরআগে সাবেক প্রধান শিক্ষক মাহবুবুর রহমানের এক আবেদনের ভিত্তিতে ওই বছরের ৮ মে বোর্ড থেকে মোরশেদ আলমের কমিটি স্থগিত করা হয়। তখন বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে কামাল হোসেন ৫ আগস্ট কমিটি পুনর্বহালের জন্য শিক্ষাবোর্ডে আবেদন করলে ২০ আগস্ট স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে শিক্ষাবোর্ড। ওইদিন সন্ধ্যায় বোর্ড থেকে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের চিঠি নিয়ে হাতে হাতে নিয়ে আসেন কামাল হোসেন। এদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে পুনর্বহালকৃত সভাপতি মোরশেদ আলম জেলা শহরের হায়দার কমপ্লেক্সে শিক্ষকদের উপস্থিতিতে কামাল হোসেনকে সিনিয়র সহকারী শিক্ষক থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেন।
কামাল হোসেন আরও জানান, সভাপতি মোরশেদ আলম ওইদিন তার কাছ থেকে একশ টাকার তিনটি স্বাক্ষরকৃত অলিখিত স্ট্যাম্প নিয়ে নেন। উপস্থিত লোকজনের সামনে তিনি স্ট্যাম্পগুলো সভাপতির কাছে হস্তান্তর করেন।
তিনি জানান, গত ৪ জুন এডহক কমিটি পুনর্গঠন করা হয়৷ এতে সভাপতি মোরশেদ আলম অভিভাবক সদস্য হিসেবে নুর হোসেন মাহমুদ নামে একজনকে রাখা হয়। ৭ জুন বিদ্যালয়ের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওইদিন বিদ্যালয়ের সভাপতি নুর হোসেন মাহমুদকে প্রশাসনিক পদে নিয়োগ প্রস্তাব নাকচ করে দেন কামাল হোসেন। এরপর ২৪ জুন দ্বিতীয় সভায় নুর হোসেন মাহমুদের মেয়ে বিদ্যালয়ের খন্ডকালীন শিক্ষক শানজানা মাহমুদের বেতন সাত হাজার টাকা থেকে এক লাফে ১০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব হয়। সেই সাথে পূর্বের ছয় মাসের বেতন পরিশোধেরও প্রস্তাব হয়৷ তবে শিক্ষকদের ১৩ মাসের ভাতা বকেয়া থাকলেও সে বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত দেয়নি৷ এছাড়া সভাপতি মোরশেদ আলম বিদ্যালয়ের আনুষাঙ্গিক খরচের জন্য মোটা অংকের টাকা উত্তোলনের প্রস্তাব করলেও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কামাল হোসেন অপারগতা প্রকাশ করেন৷ এ নিয়ে সভাপতি এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। এরজেরে গত ৫ জুলাই বিদ্যালয়ের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা চলাকালীন সভাপতি এবং অভিভাবক সদস্য ভারপ্রাপ্ত প্রধানের কাছ থেকে আয়-ব্যয়ের হিসেবে দাবি করেন এবং চাপ প্রয়োগ করেন। একপর্যায়ে সভাপতি কোন সভার সিদ্ধান্ত ছাড়াই ১৯ জুলাই বিশেষ জরুরি নোটিশের মাধ্যমে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে সভাপতির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য চিঠি দেন। ওই নোটিশের প্রেক্ষিতে কামাল হোসেন ২০ জুলাই কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে কমিটি স্থগিতের জন্য অভিযোগ দাখিল করেন। পরিদিন বোর্ড থেকে সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কামাল হোসেন বলেন, আমাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে নিয়োগের দিন সভাপতি মোরশেদ আলম আমাকে তার কব্জায় রাখতে একশ টাকার তিনটি অলিখিত স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেন৷ সরল বিশ্বাসে আমিও স্বাক্ষর করি। তিনি অভিভাবক সদস্য নুর হোসেন মাহমুদকে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিতে চেয়েছেন। এছাড়া কমিটির প্রথম সভায় মোটা অংকের টাকা উত্তোলনের প্রস্তাব করেন। আমি রাজি না হওয়ায় তার চক্ষুশূল হয়ে পড়ি। ফলে অবৈধ জরুরি নোটিশের মাধ্যমে আমাকে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেন৷ তাই আমি বোর্ডে কমিটি স্থগিতের আবেদন এবং অলিখিত স্ট্যাম্পের বিষয়টি অবহিত করি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সভাপতি ওই স্ট্যাম্পে আমার কাছে ১০ লাখ টাকা টাকা পাবার কথা উল্লেখ করে এবং স্ট্যাম্পে পুরনো তারিখ বসিয়ে আদালতে মামলা করেন। আমি ওনার কাছ থেকে কোন টাকা ধার নিইনি।
সভাপতি মামলা করার আগেই আমি আদালতে স্ট্যাম্প উদ্ধারের জন্য ৯৮ ধারায় মামলা দায়ের করি। এছাড়া তিনি যে আমার থেকে অলিখিত ৩ টি স্ট্যাম্প নিয়েছে তা উনার স্বাক্ষরিত রেজুলেশনে উল্লেখ আছে।
সভাপতি মোরশেদ আলম বলেন, শিক্ষক কামাল হোসেন আমার থেকে ১০ লাখ টাকা ধার নিয়েছে। স্ট্যাম্প এবং মামলার এজাহারে বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তার কাছ থেকে অলিখিত কোন স্ট্যাম্প আমি নিইনি।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোস্তফা হোসেন বলেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কামাল হোসেনের দায়েরকৃত অভিযোগ শিক্ষাবোর্ড থেকে তদন্তের জন্য আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামী ৩ আগস্ট উভয়পক্ষকে স্বাক্ষী-প্রমান নিয়ে হাজিরের জন্য চিঠি দিয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।