শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান । আশির দশকজুড়ে তিনি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-আইএলও এবং আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন-আইটিইউসিতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি। বর্তমানে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলসেরও নির্বাহী পরিচালক। মহান মে দিবস উপলক্ষে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন
গত বছর মে দিবসে সমকালে আপনার সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল। এর পর এক বছর কেটে গেল, এই সময়ে দেশের শ্রমিকদের জীবনে কোনো পরিবর্তন দেখতে পেয়েছেন?
একই সঙ্গে কিছু দুঃখজনক ঘটনাও এ সময়ে ঘটেছে। জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদের পরই ছিল শ্রমিকের অংশগ্রহণ। বহু রিকশা রীতিমতো আহত-নিহতদের হাসপাতালে নেওয়ার অ্যাম্বুলেন্সে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনের পর শ্রমিকদের আবারও সেই পুরোনো বহু সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়েছে। কারখানা বন্ধ, বকেয়া মজুরি না পাওয়া, ঈদের সময় বেতন-বোনাস বঞ্চনা, এগুলো চাইতে গিয়ে রাস্তায় আবারও গুলি খাওয়া ইত্যাদি দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে।
এমন বাস্তবতায় শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো কী ভাগ্য হতে পারে? যে আন্দোলনের ফল হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার এবং শ্রম সংস্কার কমিশন গঠিত হয়েছে, তার মূল কথা ছিল বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। বিদ্যমান রাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার শ্রমজীবী মানুষ। এ বৈষম্য হ্রাসের দায় আছে বর্তমান সরকারের। তাই তারা আন্তরিকভাবেই চেয়েছে যে কমিশন ভালো কিছু সুপারিশ করুক।
আপনি বলছেন, শ্রম কমিশনের সুপারিশগুলো বেশ মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে? সুপারিশগুলো তৈরি করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থান– এই তিনটির নির্যাস হলো, একটি মর্যাদাকর বাংলাদেশ চাই, বৈষম্যহীন সমাজ চাই এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ চাই। আর এগুলোই মে দিবসের চেতনা। আপনি দেখবেন, মে দিবস সৃষ্টির পর যেসব আন্তর্জাতিক কনভেনশন বা সনদ হয়েছে– জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা, আইএলওর প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি– সবক’টিতেই ওই আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। তাই ওই তিনটি বিষয়কে আমরা সুপারিশের ভিত্তি ধরেছি। সেটা করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, সাড়ে সাত কোটি শ্রমজীবী মানুষ পরিষ্কার দুই ভাগে বিভক্ত। একটি অংশের– যারা মোট শ্রমিকের ১০-১৫ শতাংশ– মোটামুটি আইনি সুরক্ষা আছে, তারা ভোগ করতে পারুক না-পারুক। বাকি ৮৫-৯০ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করে, তাদের কোনো আইনি সুরক্ষা নেই, শ্রমিক হিসেবেই স্বীকৃত না তারা। এই বৈষম্য আমরা বিবেচনায় নিয়েছি।
আরেকটি বড় বিষয় হলো, আয়বৈষম্য। কিছুদিন আগে সমকালেই গত সাত মাসে কোটিপতি বাড়ার খবর দেখেছি। আবার বিশ্বব্যাংক বলেছে, চলমান অর্থবছরে নতুন ৩০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের কবলে পড়বে। এগুলোর উত্তর হলো, একটি মর্যাদাকর মজুরির নিশ্চয়তা। এ জন্যই আমরা জাতীয় ন্যূনতম মজুরির সুপারিশ করেছি, যা হতে হবে মর্যাদাকর জীবনের নিশ্চয়তাদানকারী, যেনতেন হলে চলবে না।
: প্রাতিষ্ঠানিক খাতের মজুরিই তো পুরো কার্যকর হয় না। সেখানে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কীভাবে কার্যকর করা যাবে?
জাতীয় ন্যূনতম মজুরির দাবি আমাদের শ্রমিক আন্দোলনে অনেক পুরোনো। আমরা মনে করি, সস্তা শ্রম আমাদের রপ্তানি পণ্যকে প্রতিযোগিতাসক্ষম করছে– এ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাকে এত টাকা মজুরি দিলেই চলবে, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আর কিছু করতে হবে না। এ মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ফলে মজুরির বিষয় শুধু শ্রমিকের নয়, সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে তো সরকার এখনও আয়করের আওতায়ই আনতে পারেনি, সেখানে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কার্যকর করা যাবে?
: বিষয়টি জটিল, সন্দেহ নেই। কারণ জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কিন্তু শুধু অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্প বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়, পারিবারিক ও ব্যক্তিগতভাবেও যে শ্রমিক যেমন– গাড়িচালক, গৃহকর্মী খাটানো হয়, তাদের জন্যও প্রযোজ্য হবে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে যে বিশালসংখ্যক শ্রমিক নিয়োগ হয়, তারাও পড়বে এর আওতায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, যদি একটি বৈষম্যমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ চাই, তাহলে প্রথমেই সবার জন্য একটি মর্যাদাকর জীবন নিশ্চিত করতে হবে। যেখানে মর্যাদাকর মজুরি অপরিহার্য।
আপনারা শ্রমঘন শিল্পের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছেন। কিন্তু শিল্পে অটোমেশন অনিবার্য। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা কীভাবে করা হবে?
: আমরা যদি মে দিবসের চেতনা অনুসারে ৮ ঘণ্টা কাজের বিধান মেনে চলি, একজনকে অতিরিক্ত খাটিয়ে মুনাফা করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসি, তাহলে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মুনাফার পাশাপাশি শিল্পেরও বিকাশ নিশ্চিত করতে পারি। এখানে অটোমেশন কোনো সমস্য নয়। আমাদের এখানে এক সুয়ারেজ লাইন পরিষ্কার করতে গিয়ে বছরে বহু লোক মারা যায়। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশে কাজটা হয় যন্ত্রের মাধ্যমে, আপনি চাইলেও শারীরিকভাবে তা করতে পারবেন না; ওদের সিস্টেম এমনভাবেই তৈরি। যে যন্ত্র মানুষের কাজ করবে সেই যন্ত্র তৈরির জন্যই তো মানুষ লাগবে। আমাদের বিশাল কৃষি খাত পড়ে আছে, কৃষিভিত্তিক শিল্পের সম্ভাবনা বিশাল। উদ্যোক্তা, দক্ষ জনশক্তি ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটালে আমি মনে করি, আমরা বিশ্বে অন্যতম শিল্পশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারি।
: আপনারা ট্রেড ইউনিয়ন চর্চা সহজ করার সুপারিশ করেছেন, যেখানে মালিক তো বটেই, নাগরিক সমাজেও ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ে একপ্রকার ভীতি আছে। অনেকে মনে করেন, শিল্পের বিকাশে তা অন্তরায়। আপনাদের অবস্থান একটু ব্যাখ্যা করবেন?
: এ ভয় ট্রেড ইউনিয়নের নামে কিছু ব্যক্তির নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে জন্ম নিয়েছে, সত্যিকার ট্রেড ইউনিয়ন চর্চা থেকে নয়। আমরা যে মর্যাদাকর মজুরির কথা বলি, মজুরি বৈষম্য অবসানের কথা বলি, তা নিশ্চিত হওয়ার অন্যতম শর্ত শ্রমিক ব্যক্তিগতভাবে বা যৌথভাবে তাঁর দাবি জানানোর সুযোগ পান কিনা। একটি শিল্প ইউনিটে উদ্যোক্তার মতো শ্রমিকও অপরিহার্য। কিন্তু এখানে পারস্পরিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব আছে। এ দ্বন্দ্ব নিরসনের প্রক্রিয়া হিসেবেই ট্রেড ইউনিয়নের ধারণা এসেছে। আজকে শিল্পে যে বিশৃঙ্খলা আমরা দেখি, তার প্রধান কারণ ট্রেড ইউনিয়নের সুযোগ সংকুচিত হওয়া। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রশাসনের সঙ্গে হৃদ্যতা ছাড়া আজকে ট্রেড ইউনিয়ন করা খুব কঠিন। এর গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে এমন কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা পূরণ করা সুস্থ ট্রেড ইউনিয়নপন্থি কারও পক্ষে সম্ভব নয়। যেমন– একটি কারখানায় ৫০ হাজার শ্রমিক থাকলে তার ১০ শতাংশের সমর্থন যদি একটি সংগঠনের নিবন্ধন পেতে লাগে, তাহলে ৫ হাজার শ্রমিক কে জোগাড় করতে পারবে? ট্রেড ইউনিয়ন গড়া সহজ হলে সৎ, দক্ষ ও আন্তরিক মানুষ শ্রমিক আন্দোলনে আসবেন। ফলে একটি সুস্থ ধারার ট্রেড ইউনিয়ন অনুশীলন সম্ভব হবে।
আমরা সুপারিশ করতে গিয়ে কোনোভাবেই শ্রমিককে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি বা শিল্পনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখিনি। শ্রমিকের কল্যাণকে শিল্প প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখিনি। উদ্যোক্তাদের সমস্যা আমরা জানি। সবাইকে যুক্ত করে একটি সমন্বিত নীতি ও কৌশল প্রণয়নের পক্ষে আমরা কথা বলেছি। মালিক ও শ্রমিকের সমস্যাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে আমরা শিল্পের সমস্যা সমাধান করতে পারব না। দেশও এগোবে না। এটিই আমাদের মূল বক্তব্য।