মৃত্যু ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ
মালয়েশিয়ায় একটি প্রতিষ্ঠানে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। সেই প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশি সুপারভাইজার মো. মোস্তফা আহমদ বলছেন, মৃত্যুর ১৯ দিন আগে থেকে দীন মোহাম্মদ তার প্রতিষ্ঠানের অধীনে কাজ করতে শুরু করেছিলেন।
মোস্তফা বলেন, ‘তিনি নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। যে প্রজেক্টে তিনি কাজ করছিলেন তার সুপারভাইজার আমার বন্ধু। ২৫ জুলাই রাতে তিনি তার থাকার জায়গায় এসে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। পরে রাতে কোনো এক সময় গোসলখানায় গিয়েছিলেন। সেখানেই ভোরে তাকে পড়ে থাকতে দেখেন অন্যরা। হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা যায় স্ট্রোকে মারা গিয়েছেন তিনি।’
তিনি বলেন, হাসপাতাল থেকে মৃত্যু নিশ্চিত করার পর তারা মৃতদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর কাজ শুরু করেছিলেন।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মোস্তফা বলেন, ‘পাসপোর্ট-ভিসা থাকায় ভাবলাম সহজেই মরদেহ দেশে পাঠানো যাবে। কিন্তু তার সহকর্মীদের মধ্যে তেমন কাউকে পেলাম না যিনি দীন মোহাম্মদকে ভালোভাবে চেনেন। পাসপোর্ট থেকে ফোন নম্বর নিতে গিয়ে দেখা গেল ফোন নাম্বার নেই। একজনের কাছ থেকে খবর পেলাম ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে কোনাপাড়া স্কুলের কাছে তাদের আত্মীয়-স্বজন আছে। সেখানে লোক পাঠিয়েও কারও হদিস পেলাম না।’
এরপর মোস্তফা আহমদ যোগাযোগ করেন কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ মিশন, পাসপোর্টের স্থায়ী ঠিকানায় থাকা কুমিল্লার উপজেলা প্রশাসন ও ঢাকায় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে।
তিনি বলছিলেন, ‘এখন পর্যন্ত কেউ দীন মোহাম্মদের পরিবার বা স্বজনের কোনো খোঁজ দিতে পারেনি। ওদিকে হাসপাতাল ও পুলিশ তাগাদা দিচ্ছে দ্রুত মরদেহ নেওয়ার জন্য।’
আবার পাসপোর্টে তার ব্যক্তিগত নম্বর হিসেবে যে নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি পাওয়া গেছে কুমিল্লার আরেক ব্যক্তির নামে এবং তিনি জীবিতই আছেন।
মোস্তফা আহমদ জানান, ২০১১ সালে মালয়েশিয়া সরকার যখন অবৈধ বাংলাদেশিদের বৈধ করার সুযোগ দিয়েছিল, তখন দালালদের হাতে একই জন্মনিবন্ধন নাম্বার দিয়ে অনেক পাসপোর্ট বের করার অভিযোগ উঠেছিল।
এখন তাহলে কী হবে
ওদিকে মালয়েশিয়ার নিয়ম অনুযায়ী দীন মোহাম্মদকে বেওয়ারিশ হিসেবেই দাফন করা যাবে না। মোস্তফা আহমদ বলেন, ‘আমরা সেটি করতেও পারি না। কারণ দুই দিন পর তার পরিবারের কেউ এলে কী জবাব দেব। কিন্তু মরদেহ মর্গে রাখায় প্রতিদিন আমাকে ৭৫ রিঙ্গিত ফি দিতে হচ্ছে, আবার পুলিশও ডিস্টার্ব করছে।’
মোস্তফা আহমদ জানান, তিনি বিষয়টি কুয়ালালামপুর হাইকমিশনে জানিয়েছেন এবং একই সঙ্গে ঢাকায় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে নাম্বার নিয়ে কল দিয়ে সেখানেও অবহিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে প্রথম দুই দিন কেউ ফোন ধরেনি। সবশেষে বৃহস্পতিবার এক ব্যক্তি ফোন ধরে ঘটনা শুনে শুধু বলেছেন-দেখতেছি। বাংলাদেশে কোনো অভিভাবক পেলেই হাসপাতাল ও পুলিশের সার্টিফিকেট নিয়ে মরদেহ পাঠিয়ে দেওয়া যাবে।’
বিষয়টি নিয়ে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মিনিস্টার (লেবার) সিদ্দিকুর রহমান বলেছেন যে, তারা দীন মোহাম্মদের ঠিকানা বের করার চেষ্টা করবেন।
তিনি বলেন, ‘তিনি বিভিন্ন সময়ে যাদের সঙ্গে কাজ করেছেন তাদের কাছে যাব। আশা করি, স্থায়ী ঠিকানার সন্ধান বের করতে পারবো।’
মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের ডেডবডি ইস্যু নিয়ে কাজ করেন বাংলাদেশ হাইকমিশনের লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট জেলা উপজেলার প্রশাসনের মাধ্যমে সাধারণত পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়। সেভাবে পাওয়া না গেলে তার ছবি-পাসপোর্ট সামাজিক মাধ্যমে দিয়ে অনুসন্ধানের চেষ্টা করি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা সফল হই। এক্ষেত্রেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, যাতে দীন মোহাম্মদের মরদেহ পরিবারের কাছে পাঠানো যায়।’
এদিকে ঢাকায় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও কুয়ালালামপুরে হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত কোনোভাবে দীন মোহাম্মদের কোনো অভিভাবক বা স্বজনের খোঁজ না পাওয়া গেলে হয়তো বেওয়ারিশ হিসেবেই তার ঠিকানা হতে পারে মালয়েশিয়ার মাটি।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আসলে একেবারেই কাউকে না পাওয়া গেলে আর কি-ই বা করার থাকে। কাউকে না কাউকে তো মরদেহ গ্রহণ করার জন্য পেতে হবে।’