সম্প্রতি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ (এআরটি)’ চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বহু পণ্য, যার মধ্যে হিমায়িত মুরগির মাংসও রয়েছে; বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেতে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মুরগির বাজার বাংলাদেশের বাজার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে মুরগি কেটে বিভিন্ন অংশ আলাদাভাবে বিক্রি করা হয়। মার্কিন ভোক্তাদের মধ্যে মুরগির বুকের মাংস (চিকেন ব্রেস্ট) সবচেয়ে জনপ্রিয়। যুক্তরাষ্ট্রে চিকেন ব্রেস্ট প্রতি পাউন্ড প্রায় ৩.৫০ ডলারে বিক্রি হয়, যেখানে মুরগির রান (চিকেন লেগ) বিক্রি হয় প্রতি পাউন্ড মাত্র প্রায় ১.৫০ ডলারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রসেসিং কোম্পানিগুলো চিকেন ব্রেস্ট বিক্রি করে লাভ করলেও মুরগির রান উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করে থাকে।
একজন মার্কিন রপ্তানিকারক হালাল সনদপ্রাপ্ত হিমায়িত ‘চিকেন লেগ কোয়ার্টার’ প্রতি টন এক হাজার ৪৯০ ডলার দরে (চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত সমুদ্রপথে পরিবহন ও বীমাসহ) সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি কেজির দাম দাঁড়ায় প্রায় ১.৪৯ ডলার বা প্রায় ১৮৩ টাকা। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে প্রক্রিয়াজাত মুরগি উৎপাদনের খরচ সম্ভবত প্রতি পাউন্ডে প্রায় এক ডলার। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে প্রায় ২.২০ ডলার। ফলে স্পষ্টতই এসব মুরগির রান উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত মুরগির সঙ্গে এর তুলনা করলে চিত্রটি আরও পরিষ্কার হয়। দেশে উৎপাদিত মুরগির ৯০ শতাংশেরও বেশি জীবিত অবস্থায় কাঁচাবাজারে বিক্রি হয়। তবে রেস্টুরেন্ট ও সুপারশপ প্রক্রিয়াজাত মুরগি কিনে থাকে।
বর্তমানে দেশের একজন খামারি গড়ে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি উৎপাদন করেন প্রায় ১৩৫ টাকা খরচে। মুরগি জবাইখানায় পরিবহন করলে খরচ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৩৯ টাকা প্রতি কেজি। এরপর জবাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় নাড়িভুঁড়ি, রক্ত, পালক ইত্যাদি অপসারণ করা হয়। এর ফলে অবশিষ্ট ভোজ্য অংশের প্রতি কেজির খরচ আরও বেড়ে যায়। এর সঙ্গে শ্রম ও হিমায়ন ব্যয় যুক্ত হলে প্রক্রিয়াজাত মুরগির উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২১৯ টাকা প্রতি কেজি।
অন্যদিকে আমেরিকান মুরগির রান স্থানীয় প্রক্রিয়াজাত মুরগির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে সস্তা হবে। তাই এটি খুবই স্বাভাবিক, বাংলাদেশের ভোক্তা এবং রেস্টুরেন্টগুলো আমদানি করা আমেরিকান মুরগি কেনার প্রতিই বেশি আগ্রহী হবে।
জিএটিটি এবং ডব্লিউটিওর বাণিজ্যিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পণ্য উৎপাদন খরচের নিচে রপ্তানি করা হলে আমদানিকারক দেশ সেই পণ্যের ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং ডিউটি বা অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করতে পারে। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র থেকে হিমায়িত মুরগির রান উৎপাদন খরচের নিচে রপ্তানি করা হচ্ছে, তাই বাংলাদেশ সরকারেরও এসব পণ্যের ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করার অধিকার রয়েছে।
এআরটি চুক্তির ৬.৪ অনুচ্ছেদেও এই অধিকার স্বীকৃত। সেখানে বলা হয়েছে: ‘এই চুক্তির কোনো কিছুই কোনো পক্ষকে অন্যায্য বাণিজ্যিক কার্যক্রমের প্রতিকার হিসেবে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা থেকে সীমাবদ্ধ বা বাধাগ্রস্ত করবে না।’ তবে বাংলাদেশ ইচ্ছামতো অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করতে পারে না। প্রথমে সরকারকে আনুষ্ঠানিক তদন্ত করে প্রমাণ করতে হবে– অন্যায্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম সংঘটিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে মুরগির বুকের মাংস এবং মুরগির রানের বাজারমূল্য বিশ্লেষণ করলে যে কোনো অর্থনীতিবিদ সহজেই বুঝতে পারবেন, চিকেন ব্রেস্টের উচ্চমূল্য থেকে অর্জিত মুনাফা ব্যবহার করে মুরগির রান কম দামে বিক্রি করা হচ্ছে। চিকেন ব্রেস্ট বিক্রি থেকে অর্জিত মুনাফা কার্যত চিকেন লেগ কম দামে বিক্রির ক্ষতি পুষিয়ে দিচ্ছে। তাই অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে– যুক্তরাষ্ট্র থেকে কম দামে মুরগির রান আমদানি করা আসলে ডাম্পিংয়ের শামিল।
বর্তমানে আমদানি করা হিমায়িত মুরগির ওপর মোট করের পরিমাণ ৬২ শতাংশেরও বেশি। এর মধ্যে রয়েছে: ২৫ শতাংশ কাস্টমস শুল্ক, ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর ও ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে হিমায়িত মুরগি আমদানির ওপর উচ্চ কর বজায় রেখেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের মতো দেশে মুরগির রান প্রায়ই উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করা হয়। কিন্তু এআরটি চুক্তি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা হিমায়িত মুরগির ওপর এই কর শূন্যে নেমে আসবে। ফলে আমদানি করা হিমায়িত মুরগির ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ না করা হলে বাংলাদেশের খামারিরা এক অন্যায্য ও অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন।
দেশে মুরগির খামারের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার পরিবারের জীবিকা সরাসরি এই খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এআরটি চুক্তি তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থি। তাই দেশের পোলট্রি খাতের স্বার্থ রক্ষায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।