ইসলামে দায়িত্ব ও নেতৃত্বকে অত্যন্ত গুরুতর একটি আমানত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে যোগ্যতা, সততা ও দায়িত্ববোধকে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। যখন এই আমানত তার প্রকৃত হকদারের কাছে অর্পণ করা হয়, তখন সমাজে ন্যায়, শৃঙ্খলা ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয়। আর যখন দায়িত্ব অযোগ্য ও অনুপযুক্ত ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়, তখন তা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক অবক্ষয় ও বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা প্রদান করেছেন।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ بَيْنَمَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فِي مَجْلِسٍ يُحَدِّثُ الْقَوْمَ جَاءَهُ أَعْرَابِيٌّ فَقَالَ مَتَى السَّاعَةُ فَمَضَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُحَدِّثُ، فَقَالَ بَعْضُ الْقَوْمِ سَمِعَ مَا قَالَ، فَكَرِهَ مَا قَالَ، وَقَالَ بَعْضُهُمْ بَلْ لَمْ يَسْمَعْ، حَتَّى إِذَا قَضَى حَدِيثَهُ قَالَ ” أَيْنَ ـ أُرَاهُ ـ السَّائِلُ عَنِ السَّاعَةِ ”. قَالَ هَا أَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ. قَالَ ” فَإِذَا ضُيِّعَتِ الأَمَانَةُ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ ”. قَالَ كَيْفَ إِضَاعَتُهَا قَالَ ” إِذَا وُسِّدَ الأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ ”.
আবু হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মজলিসে জনসম্মুখে কিছু আলোচনা করছিলেন। ইতিমধ্যে তাঁর নিকট জনৈক বেদুঈন এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে?’ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আলোচনায় রত থাকলেন।
এতে কেউ কেউ বললেন, লোকটি যা বলেছে তিনি তা শুনেছেন কিন্তু তার কথা পছন্দ করেননি। আর কেউ কেউ বললেন বরং তিনি শুনতেই পাননি। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলোচনা শেষে বললেন, ‘ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) সম্পর্কে প্রশ্নকারী লোকটি কোথায়?’ সে বলল, ‘এই যে আমি, হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন, যখন আমানত নষ্ট করা হয় তখন কিয়ামতের প্রতীক্ষা করবে। সে বলল, কিভাবে আমানত নষ্ট করা হয়? তিনি বললেন, ‘যখন কোন অনুপযুক্ত ব্যক্তির উপর কোন কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়, তখন তুমি কিয়ামতের অপেক্ষা করবে।
’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯)এই হাদিসটি ইসলামের নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কিত একটি মৌলিক নীতিকে অত্যন্ত গভীরভাবে তুলে ধরে। হাদিসে বর্ণিত ঘটনার প্রেক্ষাপটটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করছিলেন। এমন সময় এক বেদুঈন এসে হঠাৎ কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করে বসে। নবীজি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না দিয়ে তার আলোচনা শেষ করেন। এতে বোঝা যায়, তিনি শৃঙ্খলা, প্রেক্ষাপট ও কথার যথাযথ সময়ের প্রতি গুরুত্ব দিতেন।
পরে তিনি প্রশ্নকারীকে ডেকে এমন একটি উত্তর দিলেন, যা শুধু কিয়ামতের সময় নয়, বরং কিয়ামতের লক্ষণ ও সমাজের অবক্ষয়ের একটি মৌলিক কারণকে স্পষ্ট করে।তিনি বললেন, যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করতে। এখানে “আমানত” শব্দটি শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ বা গোপন বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর অন্তর্ভুক্ত সব ধরনের দায়িত্ব, কর্তৃত্ব, পদ, নেতৃত্ব এবং জনগণের অধিকার। অর্থাৎ সমাজ, রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের যে কোনো দায়িত্বই এক ধরনের আমানত।
এরপর যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, আমানত কীভাবে নষ্ট হয়, তখন নবীজি স্পষ্ট করে দিলেন যে, যখন কোনো কাজ বা দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়। অর্থাৎ যোগ্যতা, সততা ও দক্ষতার পরিবর্তে যদি স্বজনপ্রীতি, দলীয় স্বার্থ, লোভ, প্রভাব বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন সেটাই আমানতের খিয়ানত।
এই হাদিসের মূল বার্তা হলো, নেতৃত্ব ও দায়িত্ব কোনো সম্মান বা ক্ষমতার প্রতীক নয়; এটি জবাবদিহিমূলক একটি ভারী দায়িত্ব। অযোগ্য নেতৃত্বের ফলে ন্যায়বিচার নষ্ট হয়, দুর্নীতি বৃদ্ধি পায়, মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হয় এবং ধীরে ধীরে সমাজে অস্থিরতা, অবিশ্বাস ও অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের পরিস্থিতি বৃহত্তর বিপর্যয়ের পূর্বলক্ষণ, যা নবীজি কিয়ামতের আলামত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে উদ্দেশ্য হলো সমাজের শৃঙ্খলা ও নৈতিক ভিত্তি ভেঙে পড়া। যখন যোগ্যতা উপেক্ষিত হয় এবং অযোগ্যতা প্রাধান্য পায়, তখন তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, পুরো জাতির পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায় (ফাতহুল বারি)।
সারকথা, এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে সমাজের কল্যাণ, ন্যায়বিচার ও স্থিতিশীলতার জন্য প্রতিটি দায়িত্ব যোগ্য, সৎ ও আমানতদার ব্যক্তির হাতে অর্পণ করা অপরিহার্য। অন্যথায় তা শুধু একটি ভুল সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি বড় ধরনের সামাজিক ও নৈতিক বিপর্যয়ের সূচনা।
এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ..