শিক্ষকতা কোনো সাধারণ পেশা নয়, এটি একটি আজীবন ব্রত। এই মহান সত্যকে যিনি রক্তে, মননে এবং যাপনে ধারণ করেছিলেন, তিনি আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬, ঢাকার মিরপুরের একটি রেস্তোরাঁয় মধ্যাহ্নভোজের সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে একটি হাসপাতালে নেওয়ার পর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ৮৬ বছর বয়সে তাঁর এই আকস্মিক বিদায় দেশের মেধা ও মনন জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি।
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় ১৯৪০ সালে জন্ম নেওয়া এই প্রাজ্ঞ মানুষটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে সেখানেই বাংলা বিভাগে চার দশকেরও বেশি সময় অধ্যাপনা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মুনির চৌধুরী, আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদ ও নীলিমা ইব্রাহিমের মতো কিংবদন্তি শিক্ষকদের সংস্পর্শে এসে তাঁর প্রগতিশীল চিন্তার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। তিনি শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক ছিলেন না; মুক্তিসংগ্রাম, রাষ্ট্রচিন্তা ও দর্শনের আলোকবর্তিকা হাতে শিক্ষার্থীদের দেখিয়েছেন শোষণমুক্তির পথ।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অসীম বেদনাসিক্ত ও মহৎ। ২০১৫ সালে তাঁর একমাত্র পুত্র, জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপনকে জঙ্গিরা নির্মমভাবে হত্যা করে। সেই চরম ট্র্যাজেডির পর ক্ষুব্ধ ও হতাশ এই পিতা প্রতিশোধের বদলে বলেছিলেন, “আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক।” ধর্মনিরপেক্ষতা বা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর এই গভীর মানবিক উচ্চারণ দেশের বিচার ব্যবস্থা ও সমাজ কাঠামোকে এক বড় কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল। তাঁর কন্যা অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে অনন্য অবদান রেখেছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন
বাংলা একাডেমির সভাপতির। ভূষিত হয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে । এই মানুষটি তাঁর ষাট বছরের দীর্ঘ লেখালেখির জীবনে পঞ্চাশটিরও বেশি মৌলিক ও সম্পাদিত গ্রন্থ রেখে গেছেন। ‘লোকায়ত’ সাময়িকীর সম্পাদনা থেকে শুরু করে বার্ট্রান্ড রাসেলের অনুবাদ—সবখানেই তাঁর তীক্ষ্ণ ইতিহাস-সচেতনতা ও বাস্তবতাবোধের ছাপ স্পষ্ট। ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানসহ দেশের প্রতিটি ক্রান্তিকালে তিনি সাধারণ মানুষের পক্ষে, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থেকেছেন।
টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা বিভিন্ন সেমিনারে সহ-অতিথি হিসেবে তাঁর সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো আজ স্মৃতির পাতায় উজ্জ্বল। দেখা হলেই বৈষয়িক আলাপের বাইরে গিয়ে জানতে চাইতেন, “এখন কী লিখছেন? কী নিয়ে কাজ করছেন?” তরুণ প্রজন্মকে বই পড়ার প্রতি আকৃষ্ট করা এবং দেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করাই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান।
কথাশিল্পী শওকত ওসমানের মতো তিনিও ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবতার মুক্তির আজীবন সাধক। জালালুদ্দিন রুমি কিংবা কনফুসিয়াসের দর্শনের মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন অহংকারহীন সুশিক্ষায়, যা মানুষের মনকে ভেতর থেকে বদলে দেয়। বিল গেটসের মায়ের সেই উপদেশের মতোই তিনি বড় ও ভিন্নধর্মী চিন্তার বীজ বুনে গেছেন তাঁর হাজারো শিক্ষার্থীর মাঝে।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আজ আমাদের মাঝে নেই। তাঁর সেই চিরচেনা কণ্ঠ আর নতুন কোনো দিকনির্দেশনা দেবে না। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া প্রগতিশীল রাষ্ট্রচিন্তা, সমাজদর্শন এবং কালজয়ী লেখাগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আমাদের পথ দেখাবে। হে আলোর দিশারি, আপনার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসা।
লেখক: অধ্যাপক ডক্টর দিপু সিদ্দিকী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কবি এবং প্রাবন্ধিক