এ টি এম কামাল
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু নাম কেবল একটি রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। সময়ের সীমানা অতিক্রম করে তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি রাজনৈতিক যুগের প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্রের জন্য তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে।
তাঁকে কেউ ‘গণতন্ত্রের মাতা’ হিসেবে অভিহিত করেন, কেউ ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে চেনেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে যেমন প্রবল সমর্থন রয়েছে, তেমনি রয়েছে তীব্র সমালোচনা ও মতপার্থক্য। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এসব ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।
বরং সময় এসেছে দলীয় আবেগ ও রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনকে ইতিহাসের বৃহত্তর পরিসরে মূল্যায়ন করার।
আমার কাছে প্রশ্নটি হলো—গণতন্ত্রের জন্য একজন রাজনৈতিক নেতার দীর্ঘ সংগ্রাম, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান এবং জনগণের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কি শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি সেই অবদানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির কথাও ভাবা উচিত?
এই প্রশ্ন থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার প্রসঙ্গ সামনে আসে।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী অ্যাপারথেইড ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নেলসন ম্যান্ডেলা দীর্ঘ সংগ্রাম করেছেন। বছরের পর বছর কারাবরণ করেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রাম দক্ষিণ আফ্রিকার গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে। ১৯৯৩ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা ও এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন।
বাংলাদেশের ইতিহাস আর দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাস এক নয়। ম্যান্ডেলার সংগ্রাম ছিল অ্যাপারথেইডের বিরুদ্ধে, আর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই তাঁদের সরাসরি একই পাল্লায় মাপা ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হবে না।
কিন্তু একটি জায়গায় প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সংগ্রাম কি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিষয় হতে পারে না?
অবশ্যই পারে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে ১৯৯০ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জোট, ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ অংশ নিয়েছিল। সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ আন্দোলনের একটি ঐতিহাসিক পরিণতি ঘটে। এরপর বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় এবং দেশ নির্বাচনী গণতন্ত্রের পথে ফিরে যায়।
এরপর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয় এবং বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
কিন্তু এখানেই তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকার মূল্যায়ন শেষ করা যাবে না।
১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ধারায় ফিরে যাওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
একজন রাজনৈতিক নেতার ইতিহাস মূল্যায়ন করতে গেলে তিনি কীভাবে ক্ষমতায় এসেছেন, তার পাশাপাশি তিনি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোকে কোন দিকে নিয়ে গেছেন, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি।
এই জায়গায় খালেদা জিয়ার ভূমিকা নিঃসন্দেহে আলোচনার দাবি রাখে।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি বৈশিষ্ট্য ছিল দৃঢ় অবস্থান। সেই অবস্থানকে কেউ রাজনৈতিক দৃঢ়তা হিসেবে দেখেছেন, কেউ অনমনীয়তা হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে কোনো নেতার রাজনৈতিক অবস্থানকে শুধু পছন্দ-অপছন্দের মাপকাঠিতে বিচার করলে সেই ইতিহাস কখনো পূর্ণাঙ্গ হয় না।
খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
তিনি বহুবার রাজনৈতিক ক্ষমতায় ছিলেন। আবার দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরেও ছিলেন। তিনি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, সরকার পরিচালনা করেছেন, রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন এবং নানা সংকটের মধ্যেও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখেছেন।
একজন নারী হিসেবে বাংলাদেশের অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশে এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দেওয়া এবং জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠাও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে খালেদা জিয়ার মূল্যায়ন করতে গিয়ে শুধু প্রশংসার কথাই বলা উচিত নয়। তাঁর শাসনামল নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত, বিরোধী দলের সঙ্গে তীব্র দ্বন্দ্ব, হরতাল, নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক এবং বিভিন্ন অভিযোগ—এসবও ইতিহাসের অংশ। একজন ইতিহাসসচেতন মানুষ হিসেবে এসব বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য—একজন নেতার রাজনৈতিক জীবনে বিতর্ক থাকলেই তাঁর ইতিবাচক ভূমিকা ইতিহাস থেকে মুছে যায় না।
ইতিহাস কাউকে দেবতা বানায় না, আবার কাউকে সম্পূর্ণ অন্ধকারেও ঠেলে দেয় না। ইতিহাস সময়ের ঘটনাগুলোকে পাশাপাশি রেখে বিচার করে।
সেই বিচারে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
এখন আসি নোবেল শান্তি পুরস্কারের প্রসঙ্গে।
অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন—যদি নেলসন ম্যান্ডেলাকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা যায়, তাহলে খালেদা জিয়াকে কেন নয়?
প্রশ্নটি আবেগের জায়গা থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু বাস্তবতার জায়গা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।
নোবেল ফাউন্ডেশনের বর্তমান বিধি অনুযায়ী সাধারণ নিয়মে কোনো ব্যক্তিকে তাঁর মৃত্যুর পর নতুন করে নোবেল পুরস্কার দেওয়া যায় না। অর্থাৎ বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে মরণোত্তর নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবি বর্তমান নোবেল বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কিন্তু তাই বলে কি তাঁর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবি শেষ হয়ে যায়?
আমি তা মনে করি না।
বরং এখানেই আমাদের চিন্তাকে আরও বিস্তৃত করতে হবে।
নোবেল শান্তি পুরস্কার পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারগুলোর একটি। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শান্তি ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য আরও বহু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার রয়েছে।
তাহলে বেগম খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া যাবে না কেন?কেন তাঁর নামে একটি আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র পুরস্কার প্রতিষ্ঠিত হবে না?কেন আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাঁর গণতান্ত্রিক সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হবে না?কেন বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গণতন্ত্রবিষয়ক সংগঠনগুলো তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে গবেষণা ও আলোচনা করবে না?আমার কাছে মনে হয়, এই প্রশ্নগুলো এখন গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার সময় এসেছে।
কারণ খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার শুধু বিএনপির বিষয় নয়। ১৯৯০-এর গণআন্দোলন কোনো একক দলের আন্দোলন ছিল না। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল।
সেই আন্দোলনের ইতিহাসে খালেদা জিয়া ছিলেন অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মুখ।তাই তাঁর অবদানকে দলীয় সম্পত্তি হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
একইভাবে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের অবদানও ইতিহাসে যথাযথভাবে মূল্যায়িত হওয়া উচিত। কারণ একটি জাতির গণতান্ত্রিক ইতিহাস কখনো একজন মানুষের হাতে তৈরি হয় না।
কিন্তু এই সত্যও অস্বীকার করা যায় না যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়ার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু একজন রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে শেষ করে দেয় না।
বরং অনেক সময় মৃত্যুর পর একজন নেতার রাজনৈতিক জীবনকে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়।জীবদ্দশায় দলীয় রাজনীতি, রাজনৈতিক সংঘাত এবং আবেগ একজন নেতার মূল্যায়নকে প্রভাবিত করে। কিন্তু সময়ের দূরত্ব তৈরি হলে ইতিহাসের বিচার অনেক বেশি নির্মোহ হতে পারে।খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও এখন সেই নির্মোহ মূল্যায়নের প্রয়োজন।