বাংলাদেশ-চীন যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত পায়রা বিদ্যুৎ প্রকল্পও দেশের বিদ্যুৎ খাতের বড় প্রকল্পগুলোর একটি। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি সঞ্চালন ও অবকাঠামো উন্নয়নেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ রয়েছে। বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনার অন্যতম বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে ঢাকা-চট্টগ্রাম উচ্চগতির রেল প্রকল্প। প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মধ্যে দ্রুত রেল যোগাযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত রেলপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ২২৫ থেকে ২৩১ কিলোমিটার। বর্তমান রেলপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩২১ কিলোমিটার। পরিকল্পনা অনুযায়ী ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি হতে পারে ঘণ্টায় ৩০০ কিলোমিটার এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম যাত্রায় সময় লাগতে পারে ৫৫ থেকে ৭৫ মিনিট। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯৩ থেকে ৯৭ হাজার কোটি টাকা। চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ডিজাইন করপোরেশন (সিআরডিসি) প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও নকশা প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল। তবে উচ্চ ব্যয়ের কারণে প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এর সুফল শুধু দ্রুত যাত্রী পরিবহনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম ও মিরসরাইকে যুক্ত করে এটি একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক করিডরে পরিণত হতে পারে। দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা শিল্প বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে পারে।
বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঈনুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। একই সঙ্গে বন্দরনির্ভর শিল্প, মিরসরাই শিল্পনগর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের সম্ভাব্য শিল্পায়নের কারণে অঞ্চলটি ভবিষ্যতের উৎপাদন ও রপ্তানি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে বে টার্মিনাল প্রকল্পও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা ও পণ্য পরিবহনের দক্ষতা বাড়বে। এতে রপ্তানি ও আমদানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় বাংলাদেশে রেল, সড়ক, বন্দর, বিদ্যুৎ ও শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ছে। তবে ভবিষ্যতে এ সহযোগিতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি দেশে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং রপ্তানি সম্প্রসারণ।
মঈনুল ইসলামের মতে, চীনা বিনিয়োগ যদি বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চল, রপ্তানিমুখী উৎপাদন ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তা শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমাতেই সহায়তা করবে না, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও বাড়াবে। ফলে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বেশি পণ্য আমদানি নয়; বরং চীনা বিনিয়োগে বাংলাদেশে উৎপাদন, চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ এবং প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তর। ঢাকা-চট্টগ্রাম উচ্চগতির রেল, চট্টগ্রাম বন্দর উন্নয়ন, চীনা বিনিয়োগ এবং বাজার সুবিধা সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে আমদানিনির্ভর বাণিজ্য সম্পর্ক ধীরে ধীরে বিনিয়োগ ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ নিতে পারে।