দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রকাশিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার দ্বাদশ সংখ্যায় ছাপা হয় কাজী নজরুলের কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’। এ কবিতায় নজরুল ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীকে পরাক্রমশালী ‘অসুর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন যেন তিনি শুধু মাটির মূর্তিতে আবদ্ধ না থেকে, অসুর বিনাশের জন্য জাগ্রত হন। ভারতবাসীকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করতে তিনি তাঁর কবিতায় আহ্বান জানান।
কবিতা ও রাজনৈতিক সাংবাদিকতায় নজরুলের আপসহীন অবস্থান তাঁকে ঔপনিবেশিক সরকারের রোষের মুখে ঠেলে দেয় উল্লেখ করে নজরুল গবেষক মজিদ মাহমুদ আরো বলেন, আনন্দময়ীর আগমনের মতো কবিতা এবং ধূমকেতুর সাহসী সম্পাদকীয় বাংলা সাহিত্যের নতুন ভাষা ও চেতনার সঞ্চার করে। একই সঙ্গে এগুলো পরাধীন মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে তীব্র করে তোলে। আর নজরুলের কাছে সাহিত্য চর্চা ও মুক্তিসংগ্রাম বিচ্ছিন্ন বিষয় ছিল না। তাঁর কবিতার প্রতিবাদ ও কারাগারের অনশন একই নৈতিক দৃঢ়তায় প্রকাশ পেয়েছিল।
‘ধূমকেতু’ পত্রিকা বাজেয়াপ্ত
‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটির তীক্ষ্ণ ও বিপ্লবী ভাষা তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর ভিত নাড়িয়ে দেয়। কবিতাটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটে যেতে পারে এই আশঙ্কায় ১৯২২ সালের ৮ নভেম্বর পুলিশ কলকাতার ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার কার্যালয়ে হানা দেয়।
পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার ওই সংখ্যাটি বাজেয়াপ্ত করে।
নজরুলের যুগবাণী, বিষের বাঁশি, ভাঙার গান, প্রলয় শিখা, চন্দ্রবিন্দু গ্রন্থগুলো বাজেয়াপ্ত করার উদাহরণ টেনে নজরুল গবেষক মজিদ মাহমুদ বলেন, নজরুলের প্রতিবাদী সাহিত্যকে ঔপনিবেশিক সরকার কতটা বিপজ্জনক মনে করত, তার বই বাজেয়াপ্ত করার ঘটনাগুলো তার প্রমাণ ।
কবিতার জন্য গ্রেপ্তার কবি
১৯২২ সালের ৮ নভেম্বর নজরুলের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এই পরোয়ানা জারির সময় নজরুল কলকাতায় ছিলেন না। তিনি তখন ত্রিপুরা জেলার কুমিল্লায় (বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা) অবস্থান করছিলেন। ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর কুমিল্লার ঝাউতলার মোড় থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এরপর নজরুলকে কড়া পুলিশি পাহারায় কুমিল্লা থেকে কলকাতায় নিয়ে এসে প্রেসিডেন্সি জেলে রাখা হয়।
ঐতিহাসিক রাজবন্দীর জবানবন্দী
কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নজরুলের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের মামলার বিচার শুরু হয়। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কবি নজরুল ১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারি লিখিত জবানবন্দী পাঠ করেন। নজরুলের সেই ঐতিহাসিক জবানবন্দীটি ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে অমর হয়ে আছে।
কবি নজরুল ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ গ্রন্থে উল্লিখিত ঐতিহাসিক সে জবানবন্দীতে কবি নজরুল বলেন, ‘আমার ওপর অভিযোগ আমি রাজদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দী এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত। আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা, ভগবানের বাণী। সে-বাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে-বাণী ন্যায়-দ্রোহী নয়, সত্য-দ্রোহী নয়। সে-বাণী রাজদ্বারে দণ্ডিত হতে পারে, কিন্তু ধর্মের আলোকে, ন্যায়ের দুয়ারে তাহা নিরপরাধ, নিষ্কলুষ, অম্লান, অনির্বাণ সত্য-স্বরূপ।’
নজরুলের এ রাজবন্দীর জবানবন্দী কাব্যিক সৌন্দর্যে, যুক্তির দৃঢ়তায় ও নৈতিক সাহসে সমৃদ্ধ । এটি ঔপনিবেশিক বিচারব্যবস্থার সামনে সত্য ও স্বাধীনতার পক্ষে এক নির্ভীক ঘোষণা।
কারাগারে নজরুলের অনশন
১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি নজরুলের বিরুদ্ধে বিচারের রায় ঘোষিত হয়। বিচারক সুইনহো কবিকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। এই কারাদণ্ডাদেশের পর কবি নজরুলকে প্রথমে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে এবং পরে হুগলি জেলে পাঠানো হয়। কিন্তু কারাগারের বন্দিদশায় নজরুলের সংগ্রাম থেমে থাকেনি। হুগলি কারাগারে রাজবন্দিদের ওপর জেল কর্তৃপক্ষের অমানবিক নির্যাতন ও বৈষম্যের প্রতিবাদে ১৯২৩ সালের ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ) শুরু করে টানা প্রায় ৪০ দিন মরণপণ অনশন করেন কাজী নজরুল ইসলাম। কারাগারের বন্দিদশাতেই নজরুল রচনা করেন তার কালজয়ী কিছু গান ও কবিতা— ‘এই শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল’, ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ কিংবা ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব’।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের টেলিগ্রাম ও বসন্ত নাটক উৎসর্গ
কারাগারে অনশন যত দীর্ঘ হতে থাকে, নজরুলের স্বাস্থ্যের তত অবনতি ঘটতে থাকে। এই অনশনের খবর জেলের প্রাচীর পেরিয়ে বাইরে পৌঁছালে প্রবল আলোড়ন ও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। কবির স্বাস্থ্যের অবনতির খবরে বিচলিত হয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক ঐতিহাসিক টেলিগ্রাম পাঠান। সেই টেলিগ্রামে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুলকে লেখেন, ‘গিভআপ হাঙ্গার স্ট্রাইক, আওয়ার লিটারেচার ক্লেইমস ইউ’। কিন্তু নজরুলকে আলিপুর জেল থেকে হুগলি জেলে স্থানান্তর করায় তাঁর হাতে এটি তখন আর পৌঁছেনি।
এদিকে এর আগে একই বছর রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছিলেন।
তবে শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ রাজরোষের সব বাধা পেরিয়ে ১৯২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর বহরমপুর জেল থেকে মুক্তি পান বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
উল্লেখ্য, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে দ্রোহের চেতনা কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গানে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, তা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। শোষণ, বঞ্চনা, সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন অবস্থান যুগে যুগে প্রতিবাদী মানুষের কণ্ঠে নতুন ভাষা ও শক্তি জুগিয়েছে।
পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছিলেন, তা আজও সব ধরনের নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। যত দিন মানুষের ওপর শোষণ-নিপীড়ন থাকবে, যত দিন মানুষ মুক্তি, সাম্য ও ন্যায়বিচারের স্বপ্ন দেখবে, তত দিন নজরুলের দ্রোহী সৃষ্টিকর্ম প্রতিবাদের ভাষা হয়ে মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত থাকবে।