বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) থেকে সারা দেশে একযোগে শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা। সম্পূর্ণ পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে অনুষ্ঠেয় এবারের পরীক্ষায় দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে প্রথমবারের মতো অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।
পরীক্ষা শেষ হবে আগামী ৮ আগস্ট এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা ১৫ আগস্টের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে।
এ বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডে (৯টি সাধারণ, মাদরাসা ও কারিগরি) মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। সারা দেশের ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষা উপলক্ষে কেন্দ্রগুলোর ২০০ গজের মধ্যে পরীক্ষার্থী ও পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া সাধারণ মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
বুধবার (১ জুলাই) সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরীক্ষার সার্বিক প্রস্তুতি তুলে ধরেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
পরীক্ষা সূচি ও বিশেষ নির্দেশনা
নির্ধারিত দিনগুলোতে সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত প্রথম শিফট এবং বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দ্বিতীয় শিফটের পরীক্ষা চলবে। পরীক্ষার্থীদের অবশ্যই পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে আসনে বসতে হবে।
প্রথমে বহুনির্বাচনী (এমসিকিউ) ও পরে সৃজনশীল/রচনামূলক (সিকিউ) পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে এবং দুই অংশের মাঝে কোনো বিরতি থাকবে না।
৩০ নম্বরের এমসিকিউ পরীক্ষার জন্য ৩০ মিনিট এবং ৭০ নম্বরের সিকিউ পরীক্ষার জন্য ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট সময় নির্ধারিত থাকবে। তবে ব্যবহারিক বিষয়সংবলিত পরীক্ষার ক্ষেত্রে ২৫ নম্বরের এমসিকিউর জন্য ২৫ মিনিট এবং ৫০ নম্বরের সিকিউর জন্য ২ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট সময় দেওয়া হবে।
পরীক্ষার্থীরা কেবল সাধারণ সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর (নন-প্রোগ্রামেবল) ও কাঁটাযুক্ত সাধারণ হাতঘড়ি ব্যবহার করতে পারবেন। কেন্দ্র সচিব ছাড়া অন্য কারও মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ নেই।
সিসিটিভি ও বডি ওর্ন ক্যামেরার নজিরবিহীন নিরাপত্তা
নকল ও অনিয়ম ঠেকাতে এবার নজিরবিহীন কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
প্রতিটি পরীক্ষা কক্ষে প্রতি ২০ জন পরীক্ষার্থীর জন্য একজন করে কক্ষপরিদর্শক থাকবেন। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা মন্ত্রণালয়ের ‘সিসিটিভি ক্যামেরা মনিটরিং সেল’ থেকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হবে। এছাড়া দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাদের শরীরে ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ থাকবে।
শিক্ষা প্রশাসন জানিয়েছে, নকল ধরা পড়লে পরীক্ষার্থীর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি নকল লুকাতে পারে এমন সন্দেহে কেন্দ্রের টয়লেটগুলোতে আকস্মিক তল্লাশি চালানো হবে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, প্রশ্নফাঁসের কোনো সুযোগ নেই। তবে কোথাও এমন ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক সারা দেশের পরীক্ষা স্থগিত করে নতুন প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হবে।
নিবন্ধন করেও পরীক্ষার বাইরে সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থী
এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন করেও প্রায় সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেনি, যা মোট নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর প্রায় ৩৬.৪৬ শতাংশ।
তথ্য অনুযায়ী, মোট ১৪ লাখ ৯১ হাজার ৯৩২ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করলেও চূড়ান্তভাবে ফরম পূরণ করেছে ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৩ জন। ফলে ৫ লাখ ৪৩ হাজার ৯৮৯ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা শুরুর আগেই ঝরে গেছে।
বোর্ডভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়
সাধারণ শিক্ষা বোর্ড : ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন (৩৩.০৪%) ফরম পূরণ করেনি।
মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড : আলিম প্রথম বর্ষে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ জন নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬১ হাজার ৬৬০ জন (৪৪.০৭%) পরীক্ষার বাইরে রয়েছে।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ড : ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ জন নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর মধ্যে সর্বোচ্চ ৯০ হাজার ৩৪৫ জন (৫৪.৫৮%) শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেনি।
পরীক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়টি আমরা অ্যানালাইসিস করছি। আমরা শিক্ষাব্যবস্থার অসমতা দূর করতে কাজ করছি, যেন ড্রপ আউট (ঝরে পড়া) না হয়।’
মন্ত্রী জানান, নকলের জন্য খ্যাত বা বিতর্কিত ভেন্যু কেন্দ্রগুলো এবার পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। তবে হাওর, পার্বত্য অঞ্চল এবং দুর্গম চরাঞ্চলের পরীক্ষার্থীদের যাতায়াতের কথা বিবেচনা করে কিছু দূরবর্তী ভেন্যু কেন্দ্র বহাল রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ‘সেভেন্থ ডে অ্যাডভান্টিস্ট’ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় শনিবারের পরীক্ষাগুলো কেন্দ্রের ভেতরেই সূর্যাস্তের পর অনুষ্ঠিত হবে।