হাদিস শরিফে এসেছে, আল্লাহ তাআলা প্রতি রাতের শেষ প্রহরে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করে বলেন, ‘কে আছো, যে আমার কাছে দোয়া করবে, আমি তার দোয়া কবুল করব?
কে আছো, যে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আছো, যে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?’
(মুওয়াত্তা ইমাম মালেক, পৃষ্ঠা-৭৪)
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো পুরো বছর পেরিয়ে যায়, তাহাজ্জুদের সৌভাগ্য আমাদের দুই-একবারও জোটে না। দুনিয়ার ব্যস্ততা, অলসতা ও উদাসীনতা আমাদের সেই মহামূল্যবান ডাকে সাড়া দিতে দেয় না।
রমজানে আমরা সবাই সাহরির জন্য শেষ রাতে উঠি—এ যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক সুবর্ণ সুযোগ। যদি সেই সময় কমপক্ষে চার রাকাত তাহাজ্জুদ, একটু অশ্রুসিক্ত মোনাজাত এবং আন্তরিক তাওবা যুক্ত করতে পারি, তবে আমাদের জীবন বদলে যেতে পারে স্বল্প সময়েই।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি তিনবার আল্লাহর কাছে জান্নাত চায়, জান্নাত বলে—হে আল্লাহ! তাকে জান্নাত দান করুন। আর যে ব্যক্তি তিনবার জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চায়, জাহান্নাম বলে—হে আল্লাহ! তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন।’
(সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৫৫২১)
আমরা এ জীবনে কত কিছু চাই—দুনিয়ার সফলতা, অর্থ-সম্পদ, সম্মান। কিন্তু জান্নাত কি আমাদের দোয়ার তালিকায় থাকে? রমজান হোক জান্নাতের আবেদনপত্র পূরণের মাস।
জবানের হেফাজত : রোজা শুধু ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়, বরং আত্মসংযমের প্রশিক্ষণ। আর আত্মসংযমের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো জিহ্বা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ যখন সকালে ঘুম থেকে ওঠে, তখন তার সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জিহ্বাকে বলে—আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তুমি সোজা থাকলে আমরাও সোজা থাকব; তুমি বাঁকা হলে আমরাও বাঁকা হয়ে যাব।’
(জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৪০৭)
গিবত ও মিথ্যা রোজার ঢালে ছিদ্র সৃষ্টি করে। তবে রমজানে জবানের হেফাজত মানে শুধু চুপ থাকা নয়; বরং সত্য, সুন্দর ও কল্যাণকর কথা বলা।
দান-সদকা : এ মাস মানবতার পাশে দাঁড়ানোর বিশেষ সুযোগ। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ মাসে সবচেয়ে বেশি দান করতেন। দরিদ্র, এতিম, অসহায় ও রোজাদারদের ইফতার করানো—এসব কাজ শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; বরং আখিরাতের সঞ্চয়।
আমাদের চারপাশে এমন বহু মানুষ আছে, যাদের ঘরে রমজানের সাহরি-ইফতারের ব্যবস্থাটুকুও থাকে না। এ সুযোগে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু দান-সদকা, জাকাত ও ফিতরা আদায়ের মাধ্যমে আমরা সমাজে শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন জোরদার করতে পারি। রমজান যেন আনুষ্ঠানিকতা না হয়। আর না হয় যেন শুধু সাহরি-ইফতার, কেনাকাটা আর সামাজিক আয়োজনের মাস; বরং এটি হোক আত্মপরিবর্তনের মাস, গুনাহ থেকে প্রত্যাবর্তনের মাস, কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের মাস।
আমরা যদি সুপরিকল্পিতভাবে রমজান কাটাতে পারি, তবে এই এক মাসই আমাদের সারা বছরের নয়, হয়তো সারা জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।