সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৫৬
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
قُلِ ادۡعُوا الَّذِیۡنَ زَعَمۡتُمۡ مِّنۡ دُوۡنِهٖ فَلَا یَمۡلِكُوۡنَ كَشۡفَ الضُّرِّ عَنۡكُمۡ وَ لَا تَحۡوِیۡلًا ﴿۵۶﴾
সরল অনুবাদ
(৫৬) বলুন, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে উপাস্য মনে কর, তাদেরকে আহবান কর; করলে দেখবে তোমাদের দুঃখ-দৈন্য দূর করবার অথবা পরিবর্তন করবার শক্তি তাদের নেই।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
সুরা বনি ইসরাঈলের এই আয়াতটিতে থেকে পরিষ্কার জানা যায় যে, কেবল গায়রুল্লাহকে (আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন সত্তা) সিজদা করাই শির্ক নয় বরং আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সত্তার কাছে দোয়া চাওয়া বা তাকে সাহায্য করার জন্য ডাকাও শির্ক। দোয়া ও সাহায্য চাওয়া ইবাদতেরই অন্তর্ভুক্ত। কাজেই গায়রুল্লাহর কাছে প্রার্থনাকারী একজন মূর্তি পূজকের সমান অপরাধী।
এই আয়াতে মূলত তিনটি বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছে।
প্রথমত, দোয়া ও আহ্বান ইবাদতের অংশ।
দ্বিতীয়ত, গায়রুল্লাহর অসহায়ত্ব। আয়াতে বলা হয়েছে, তারা “দুঃখ-দৈন্য দূর করবার অথবা পরিবর্তন করবার শক্তি রাখে না।” এখানে “كشف الضر” (ক্ষতি দূর করা) এবং “تحويل” (অবস্থার পরিবর্তন) —এই দুইটি ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। কোরআনুল কারীমে বলা হয়েছে:
“وَإِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ” (সুরা ইউনুস, আয়াত : ১০৭) অর্থাৎ, আল্লাহ যদি তোমাকে কোনো কষ্ট দেন, তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই।
ইমাম ইবন কাসীর (রহ.) বলেন, মুশরিকরা যেসব মূর্তি, ফেরেশতা বা নেককার বান্দাদেরকে আহ্বান করত, তারা নিজেরাই আল্লাহর বান্দা।
তৃতীয়ত, বিশ্বাসগত ভ্রান্তি ও শির্কের মূল। অনেক সময় মানুষ সরাসরি সিজদা না করলেও মনে করে যে, অমুক পীর, অমুক ওলি, অমুক দেবতা বা শক্তি আমার ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। এই ধরনের বিশ্বাস তাওহিদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ কুরআনের শিক্ষা হলো, ক্ষমতার উৎস একমাত্র আল্লাহ। অন্য কেউ যদি কোনো উপকার করে, সেটিও আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমতিতেই করে। তাই মাধ্যমকে চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী মনে করা ভ্রান্তি।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন যে, জাগতিক ও স্বাভাবিক কারণে কারো কাছে সাহায্য চাওয়া শির্ক নয়। যেমন অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া, বিপদে বন্ধুর সহায়তা চাওয়া, এগুলো বৈধ; কারণ এগুলো প্রাকৃতিক উপায়ে এবং আল্লাহপ্রদত্ত সামর্থ্যের সীমার মধ্যে। কিন্তু অদৃশ্যভাবে ভাগ্য পরিবর্তন, গুনাহ মাফ, সন্তান দান, রোগ সারানো ইত্যাদি বিষয়ে সরাসরি গায়রুল্লাহকে আহ্বান করা কুরআনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
সবশেষে, এই আয়াত মানুষকে আত্মসমালোচনার আহ্বান জানায়। বিপদে আমরা কাকে ডাকি? অন্তরের গভীরে কার উপর নির্ভর করি? পবিত্র কোররআন মানুষকে যুক্তির ভাষায় শেখায় যে, যিনি সৃষ্টি করেছেন, রিজিক দেন, জীবন-মৃত্যুর মালিক, বিপদে উদ্ধার করেন; উপাসনা ও প্রার্থনার অধিকার একমাত্র তাঁরই।
এই আয়াত তাই শুধু মুশরিকদের প্রতি চ্যালেঞ্জ নয়; বরং প্রত্যেক যুগের মানুষের জন্য তাওহিদের এক জাগ্রত আহ্বান।