পবিত্র কোরআন মুসলিম সমাজকে তাদের ধর্ম ও জনপদ রক্ষায় প্রয়োজনীয় শক্তি ও সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে।ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তাদের মোকাবেলার জন্য তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী শক্তি ও অশ্ববাহিনী প্রস্তুত করো, তা দ্বারা তোমরা ভয় দেখাবে আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুদের এবং এরা ছাড়া অন্যদেরও, যাদের তোমরা জানো না, আল্লাহ তাদের জানেন। আর তোমরা যা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করো, তা তোমাদের পরিপূর্ণ দেওয়া হবে, তোমাদের ওপর জুলুম করা হবে না।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ৬০)
এই আয়াতগুলোতে আকাশের এক ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, যেখানে শয়তানরা আসমানের সংবাদ চুরি করতে চাইলে তাদের দিকে উল্কাপিণ্ড নিক্ষেপ করা হয়। বর্তমান আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অত্যাধুনিক ডিভাইসগুলোর ধারণা সম্ভবত এসব আয়াত থেকেই এসেছে। কারণ নিজেদের আকাশসীমায় ঢুকে পড়া শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা সন্দেহজনক বস্তুকে শনাক্ত করে আকাশেই নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার প্রক্রিয়াগুলো হুবহু কোরআনের আয়াতের সঙ্গে মিলে যায়।
তাই মুসলমানদের উচিত, মহান আল্লাহর আদেশ পালন এবং নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষার উদ্দেশ্যে মুসলিম ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। এই অঙ্গনকে অবহেলা করা নিজেদের দেশকে ধ্বংসের দিকে ডেকে নেওয়ার নামান্তর। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করো এবং নিজ হাতে নিজেদের ধ্বংসে নিক্ষেপ কোরো না। আর সুকর্ম করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৫)
এ আয়াতে স্বেচ্ছায় নিজেদের ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, ‘ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করা’ বলতে এ ক্ষেত্রে কী বোঝানো হয়েছে? এ প্রসঙ্গে তাফসিরবিদদের অভিমত বিভিন্ন প্রকার।
১. আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) বলেন, এই আয়াত আমাদের সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়েছে। আমরা এর ব্যাখ্যা উত্তমরূপেই জানি। কথা হলো এই যে আল্লাহ তাআলা ইসলামকে যখন বিজয়ী ও সুপ্রতিষ্ঠিত করলেন, তখন আমাদের মধ্যে আলোচনা হলো যে এখন আর যুদ্ধ বা প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কী প্রয়োজন? এখন আমরা আপন গৃহে অবস্থান করে বিষয়-সম্পত্তির দেখাশোনা করি। এ প্রসঙ্গেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (আবু দাউদ, হাদিস : ২৫১২)
এতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে ‘ধ্বংসের দ্বারা এখানে যুদ্ধ পরিত্যাগ করা বোঝানো হয়েছে।’ কারণ কোনো জাতি যখন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তাদের স্বাধীনতা ধরে রাখা অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। মুহূর্তেই তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ অর্থহীন হয়ে উঠতে পারে।
তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলমানের প্রকৃত শক্তি কেবল অস্ত্র বা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। মুসলমানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার ঈমান ও তাওয়াক্কুল। কোনো জাতির মধ্যে ঈমানি চেতনা না থাকলে তাদের সমরাস্ত্র ইসলামের কোনো কল্যাণে আসবে না। একই তাওয়াক্কুল না থাকলেও কোনো জাতির জন্য বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তাওয়াক্কুলের অর্থ কখনোই হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়; বরং নিজের সাধ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করে ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়ার নামই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘অতঃপর যখন তুমি দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাওয়াক্কুলের প্রকৃত অর্থ বোঝাতে এক ব্যক্তিকে বলেছিলেন, ‘তুমি প্রথমে তোমার উট বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৭)
অতএব, মুসলিম জাতি যদি তাদের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করতে চায়, তবে তাদের উচিত ঈমান ও আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তিতে সমৃদ্ধ হওয়া। সৎ নিয়ত নিয়ে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হলে তা যেমন জাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, তেমনি আল্লাহর আদেশ পালনের সওয়াবও বয়ে আনবে।