রুকন উদ্দিন, কেন্দুয়া:
স্বপ্নের দেশ ইতালিতে পাড়ি জমিয়ে অনেকেই ভেবেছিলেন, প্রবাসের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু বাস্তবতা অনেকের জন্য হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিভিন্নভাবে ইতালিতে গিয়ে বৈধ কাগজপত্র না থাকায়, আকামা বা প্রয়োজনীয় বৈধতার অভাবে কাজের সুযোগ হারিয়ে শত শত বাংলাদেশি প্রবাসী মানবেতর জীবনযাপন করে থাকেন। কেউ কাজের সন্ধানে দিনের পর দিন ঘুরে, কেউ আবার থাকার জায়গা ও খাবারের সংকটেও পড়েন।
এমন দুর্দিনে অসহায় এসব প্রবাসীদের পাশে দাঁড়িয়ে ইতালিতে সকল ধরনের সহযোগিতা করেন মানবিক এক বাংলাদেশি। তিনি নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার ১১নং চিরাং ইউনিয়নের ইতালি প্রবাসী সৈয়দ আবুল মাকারিম। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ইতালিতে অবস্থানরত বিপদগ্রস্ত ও অসহায় বাঙালি প্রবাসীদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে আসছেন। বিশেষ করে কাজহীন ও বৈধ কাগজপত্রের জটিলতায় পড়া অনেক প্রবাসীকে কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নানা ধরনের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নানা স্বপ্ন নিয়ে অনেক মানুষ ইতালিতে পাড়ি জমান। কেউ বৈধ প্রক্রিয়ায়, আবার কেউ বিভিন্ন জটিলতার মধ্য দিয়ে দেশটিতে পৌঁছান। সেখানে যাওয়ার পর প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র না থাকায় অনেকেই নিয়মিত কাজের সুযোগ পান না। ফলে একদিকে যেমন নিজের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে, অন্যদিকে দেশে থাকা পরিবারের কাছেও টাকা পাঠাতে না পারায় তৈরি হয় নতুন সংকট।
কাজের আশায় ইতালির বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়ানো এসব মানুষের অনেকেরই থাকার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই। দিনের পর দিন কাজের সন্ধানে ছুটে বেড়াতে হয় তাদের। অনেকে পরিচিতজনের সহযোগিতায় কোনোভাবে দিন কাটালেও, বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ পাওয়া যায় না।
এই পরিস্থিতিতে ইতালি প্রবাসী সৈয়দ আবুল মাকারিমের সহযোগিতা অনেক অসহায় প্রবাসীর কাছে সবসময় আশার আলো।
কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাজের সন্ধানে থাকা অনেক বাংলাদেশিকে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কেউ নতুন করে ইতালিতে এসে বিপাকে পড়লে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে সাধ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করেন। শুধু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নয়, বিপদগ্রস্ত প্রবাসীদের বিভিন্ন প্রয়োজনেও পাশে দাঁড়ান তিনি।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই মনে করেন, বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশি আরেকজন বাংলাদেশির পাশে দাঁড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রবাসজীবনে বিপদে পড়লে নিজের দেশের মানুষের সহযোগিতাই অনেক সময় সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে ওঠে। আব্দুল মাকারিম সেই দায়িত্ববোধ থেকেই মানবিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
এক প্রবাসী বলেন, “দেশ থেকে অনেক আশা নিয়ে ইতালিতে এসেছিলাম। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক দিন কষ্টে ছিলাম। মাকারিম ভাইয়ের সহযোগিতায় কাজের সুযোগ পেয়েছি। তার মতো মানুষ পাশে থাকলে প্রবাসে বিপদে পড়া অনেক বাংলাদেশি সাহস পাবে।”
আরেক প্রবাসী জানান, বিদেশে এসে বিপদে পড়লে অনেক সময় মানুষ মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েন। তখন পরিচিত একজন মানুষ পাশে দাঁড়িয়ে সাহস দিলে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি পাওয়া যায়। আবুল মাকারিম ভাইয়ের সহযোগিতা অনেক প্রবাসীর জন্য এমনই একটি ভরসার জায়গা তৈরি হয়েছে।
প্রবাসজীবনে নিজের ব্যস্ততার মধ্যেও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগকে ইতালিপ্রবাসী বাংলাদেশিরা ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাদের মতে, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবিকতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
সৈয়দ আবুল মাকারিমের এই উদ্যোগ শুধু কয়েকজন ব্যক্তিকে সহায়তা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রবাসে থাকা অসহায় বাংলাদেশিদের মধ্যে সহযোগিতার একটি মানসিকতা তৈরি করছে। বিশেষ করে যারা বৈধ কাগজপত্রের জটিলতা, কর্মসংস্থানের অভাব কিংবা আর্থিক সংকটে রয়েছেন, তাদের জন্য সাময়িক সহযোগিতাও অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারে। প্রবাসে থাকা বাংলাদেশিরা দেশের পরিবার-পরিজন থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকলেও নিজেদের মধ্যে তৈরি করেছেন এক ধরনের সামাজিক বন্ধন। সুখ-দুঃখে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর এই সংস্কৃতি প্রবাসজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন সৈয়দ আবুল মাকারিম।
সৈয়দ আবুল মাকারিমের কর্মকাণ্ড সেই মানবিক বন্ধনেরই একটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন অনেক প্রবাসী। তার সহযোগিতায় কাজের সুযোগ পাওয়া বা বিপদের সময়ে পাশে পাওয়া ব্যক্তিরা মনে করেন, প্রবাসে এমন উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।
ইতালি প্রবাসী সৈয়দ আবুল মাকারিম জানান, ইতালিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে যারা বিভিন্ন কারণে বৈধ কাগজপত্রের জটিলতায় রয়েছেন, তাদের আইনি ও মানবিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে। একই সঙ্গে নতুন করে যারা ইতালিতে আসছেন, তাদেরও বৈধ প্রক্রিয়া ও দেশটির আইনকানুন সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।
মানবিক সহযোগিতার পাশাপাশি প্রবাসীদের বৈধ পথে থাকার সুযোগ, কর্মসংস্থান এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে অনেক বাংলাদেশি আরও নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন বলে মনে করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করি, অন্য প্রবাসীরাও যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে অসহায় বাংলাদেশিদের পাশে দাঁড়ান, তাহলে বিদেশের মাটিতে বিপদে পড়া অনেক মানুষের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হবে। একই সঙ্গে দেশের মানুষের প্রতিও প্রবাসীদের ইতিবাচক ভূমিকার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। অভাব, অনিশ্চয়তা আর কাগজপত্রের জটিলতায় যখন অনেক প্রবাসীর স্বপ্ন ফিকে হয়ে যায়, তখন একজন বাংলাদেশি প্রবাসী হিসেবে তাদের নতুন করে বাঁচার ও ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জোগানোর চেষ্টা করে থাকি। এটাই প্রবাসের মাটিতে আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
উল্লেখ্য, সৈয়দ আবুল মাকারিম নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার ১১নং চিরাং ইউনিয়নের গোপালাশ্রম গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, মানবিক চিকিৎসক, রাজনৈতিক সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. সৈয়দ আব্দুল খালেকের ছোট ছেলে এবং কেন্দুয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আব্দুল ওয়াহাবের ছোট ভাই।