জাহিদ ইকবাল: অসুস্থ শরীর, অস্ত্রোপচারের ধকল, চিকিৎসকের পরামর্শে বিশ্রামে থাকার প্রয়োজন—সবকিছুর পরও যেন তাঁকে আটকে রাখা গেল না। হাসপাতালের বিছানা ছেড়ে সরাসরি ফিরে এসেছেন নিজের কর্মস্থলে। কারণ, তাঁর কাছে দায়িত্ব শুধু একটি পেশাগত পরিচয় নয়; বরং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এক নিরন্তর অঙ্গীকার। বলছি খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইনের কথা।
গত ৫ অক্টোবর দুপুর ১২টার দিকে হঠাৎ বুকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করেন তিনি। সময় যত গড়াতে থাকে, ব্যথার তীব্রতাও তত বাড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন অনুভব করে থানার কাছাকাছি একটি হাসপাতালে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন তিনি। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে নিকুঞ্জের সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
সেখানে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, তাঁর পিত্তথলিতে পাথর রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন দেখা দিলে তাঁকে বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শুরু হয় চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা।
অবশেষে গত শনিবার প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে পিত্তথলির পাথর অপসারণ করা হয়। সফল হয় অস্ত্রোপচার। এতে স্বস্তি ফিরে আসে তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে। যাঁরা তাঁর সুস্থতার জন্য উৎকণ্ঠায় ছিলেন, তাঁদের মনে ফিরে আসে আশার আলো।
তবে অস্ত্রোপচার সফল হওয়ার পরও শারীরিকভাবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন ছিল পর্যাপ্ত বিশ্রাম। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আরও দুই দিন হাসপাতালের বিছানায় বিশ্রাম নেন তিনি। কিন্তু এরপর যা ঘটল, তা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বাসায় ফিরে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি সরাসরি চলে যান নিজের কর্মস্থল খিলক্ষেত থানায়। যোগ দেন দায়িত্বে।
একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছে দায়িত্ব পালন নতুন কিছু নয়। কিন্তু অস্ত্রোপচারের মাত্র কয়েক দিনের মাথায় হাসপাতাল থেকে সরাসরি কর্মস্থলে ফিরে আসার ঘটনা তাঁর দায়িত্ববোধ ও কর্মনিষ্ঠাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
ইচ্ছে করলে তিনি আরও কয়েক দিন বাসায় থেকে বিশ্রাম নিতে পারতেন। শারীরিক সুস্থতাকে প্রাধান্য দিয়ে কিছুটা সময় কাটাতে পারতেন আপনজনদের সান্নিধ্যে। কিন্তু কর্মস্থলে ফেরার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তিনি যেন বুঝিয়ে দিলেন, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাঁর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর এমন প্রত্যাবর্তনে সহকর্মীদের পাশাপাশি শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। কারণ, অসুস্থতা ও অস্ত্রোপচারের পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতেই যেখানে সময়ের প্রয়োজন, সেখানে কর্মস্থলের প্রতি তাঁর এই টান নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।
খিলক্ষেত থানার ওসি হিসেবে মুহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইনের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও রয়েছে আলোচনা। বিশেষ করে জননিরাপত্তা, এলাকার শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের সমস্যার প্রতি সংবেদনশীল থাকার বিষয়গুলো একজন পুলিশ কর্মকর্তার প্রতি মানুষের প্রত্যাশার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর অসুস্থতার সময়ও সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্বেগ এবং সুস্থ হয়ে ফিরে আসার অপেক্ষা সেই প্রত্যাশারই প্রতিফলন।
তবে দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠা যেমন প্রশংসার দাবি রাখে, তেমনি একজন কর্মনিষ্ঠ মানুষের সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া তাঁর নিজের জন্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশের কাজ এমনিতেই চ্যালেঞ্জিং। দিন-রাত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নানা সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হয় তাঁদের। সেই পেশায় একজন কর্মকর্তার কর্মস্থলের প্রতি আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ নিঃসন্দেহে সহকর্মীদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।
মুহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইনের হাসপাতাল থেকে সরাসরি কর্মস্থলে ফিরে আসার ঘটনাটি তাই কেবল একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাজে যোগদানের খবর নয়; এটি দায়িত্ববোধ, কর্মনিষ্ঠা এবং নিজের পেশার প্রতি গভীর অনুরাগেরও একটি গল্প।
তবে এই গল্পের আরেকটি দিকও রয়েছে। যিনি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিনরাত দায়িত্ব পালন করেন, তাঁর নিজের সুস্থতা ও নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একজন সুস্থ ও কর্মক্ষম পুলিশ কর্মকর্তাই দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের পাশে কার্যকরভাবে দাঁড়াতে পারেন।
অস্ত্রোপচারের ধকল কাটিয়ে কর্মস্থলে ফেরা এই পুলিশ কর্মকর্তার জন্য রইল সুস্থতা ও দীর্ঘ কর্মময় জীবনের শুভকামনা।
তাঁর কর্মনিষ্ঠা মানুষের কল্যাণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখুক—এমন প্রত্যাশাই সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সচেতন মহলের।