তহবিল ও পরিধি বাড়ানোর আহ্বান: পোশাক খাতের টেকসই পানি ব্যবস্থাপনায় বিশ্বব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সাথে বিজিএমইএ এর বৈঠকবাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের পরিবেশগত সুরক্ষা, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে আজ, ০৭ অক্টোবর ২০২৬ (বুধবার), উত্তরাস্থ বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক মারা কে. ওয়ারউইক (Ms. Mara K. Warwick) এর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময়ে মিলিত হন। বিজিএমইএ এর পক্ষ থেকে আলোচনায় আরও অংশ নেন পরিচালক ড. মোঃ হাসিব উদ্দিন।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদলে অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন লিড ওয়াটার স্পেশালিস্ট ডেভিড মেলকম লর্ড (Mr. David Melcom Lord), সিনিয়র ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন স্পেশালিস্ট রোকেয়া আহমেদ, ওয়াটার স্পেশালিস্ট মো. মাহাদী হাসান এবং এনভায়রনমেন্টাল স্পেশালিস্ট বুশরা নিশাত।
বৈঠকের শুরুতেই বিজিএমইএ সভাপতি বলেন যে, পানি ব্যবস্থাপনা এখন কেবল একটি পরিবেশগত বিষয় নয়, বরং এটি আমাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সাথে সরাসরি জড়িত। বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা, বিশেষ করে ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো, পোশাক উৎপাদনের প্রতিটি স্তরে পানির ব্যবহার হ্রাস, বর্জ্যপানি পরিশোধন এবং পানি রিসাইক্লিংয়ের ডেটা বা তথ্যকে অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে দেখছেন। তাই, ঢাকার নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষার পাশাপাশি রপ্তানি বাজার টিকিয়ে রাখতে পানি সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই।
সভায় বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন ‘ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম’ (D-Water) এবং এর আওতাধীন ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ভিজিএফ (VGF – Viability Gap Funding) পাইলট প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় বিজিএমইএ এর পক্ষ থেকে ৩১টি কারখানার একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তাব করা হয়েছিল, যার মধ্য থেকে বিশ্বব্যাংক ৮টি কারখানা নিয়ে কাজ শুরু করবে। তবে টেকসই প্রযুক্তির প্রতি দেশীয় পোশাক কারখানাগুলোর বিপুল আগ্রহ ও চাহিদার তুলনায় এই ৫ মিলিয়ন ডলারের তহবিল এবং নির্বাচিত কারখানার সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। এই বাস্তবতায় বিজিএমইএ সভাপতি প্রকল্পের তহবিল এবং সামগ্রিক পরিধি আরও বড় পরিসরে বাড়ানোর জন্য বিশ্বব্যাংকের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।
তৈরি পোশাক শিল্পের দৃষ্টিকোণ থেকে পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রধান বাধাগুলো তুলে ধরে বিজিএমইএ নেতারা বলেন, পোশাক শিল্পের টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হলো এর উচ্চ বিনিয়োগ ব্যয়, যার ফলে প্রকল্পগুলোর আর্থিক কার্যকারিতা বা ফিনান্সিয়াল ভায়াবিলিটি নিশ্চিত করা উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে। বর্তমান বিশ্বমন্দার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের যথাযথ মূল্য পাওয়াও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদাররা যদি অনুদান আকারে অথবা দীর্ঘমেয়াদি ও শূন্য সুদে সহজ শর্তে বড় পরিসরে অর্থায়ন সহায়তা প্রদান করে, তবেই কেবল উদ্যোক্তাদের পক্ষে এই রূপান্তরমুখী উদ্যোগে সফলভাবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
সভায় অবকাঠামোগত বাস্তবতার ওপর আলোকপাত করে বলা হয়, অনেক কারখানার নিজস্ব বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি স্থাপনের জায়গা থাকলেও কাছাকাছি কোনো উপযুক্ত জলাশয় বা ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই; আবার অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার এককভাবে বড় প্ল্যান্ট করার আর্থিক সামর্থ্য নেই। এই সংকটের সমাধানে স্থায়ী পাইপলাইন স্থাপনের পরিবর্তে লরি বা ট্যাংকারের মাধ্যমে শিল্পবর্জ্য অপসারণ এবং ক্লাস্টারভিত্তিক শোধনাগার ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়। পাশাপাশি, এই কার্যক্রম কেবল ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের অন্যান্য শিল্প অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও দ্রুত সম্প্রসারণের আহ্বান জানানো হয়।
এ সময় শিল্প খাতের টেকসই বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে পরিবেশগত নীতি বা সরকারি নিয়মকানুন হঠাৎ পরিবর্তন না করে, তা বাস্তবায়নের আগে পর্যাপ্ত সময় ও পূর্বাভাস দেওয়ার বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়। বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেন যে, নিয়মের পূর্বাভাসযোগ্যতা বজায় থাকলে কারখানাগুলো দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগে আরও বেশি উৎসাহিত হবে।
বৈঠক শেষে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দল বিজিএমইএ নেতাদের প্রস্তাবগুলোকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সবুজ রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে লজিস্টিকস ও সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার জোরালো আশ্বাস প্রদান করেন।