গত বছরের আগস্টে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইশিবা শিগেরু এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বৈঠকে ঘোষিত আগামী ১০ বছরে ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রাকে সচল রাখতে এ বছরের সম্মেলনে বেশ কিছু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী টাকাইচির উপস্থিতিতে সম্মেলনে বিগত এক বছরে ঘোষিত ২ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের দীর্ঘ বিবরণ তুলে ধরা হয়, যা নতুন দিল্লিকে গভীরভাবে আশ্বস্ত করেছে। উভয় দেশের শীর্ষ নেতার উপস্থিতিতে আয়োজিত জয়েন্ট ইকোনমিক ফোরামে ১৫০টিরও বেশি জাপানি ও ৮০টিরও বেশি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রগুলোতেও এই সফর নতুন গতি সঞ্চার করেছে। মহাকাশ গবেষণায় ভারতের ‘লুপেক্স’ মিশন থেকে শুরু করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য অ্যামোনিয়া উৎপাদন, বায়োমিথেন প্রকল্প এবং ইস্পাত কারখানার গ্যাস প্ল্যান্ট পরিচালনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। যোগাযোগ খাতে জাপানের সহায়তায় গড়ে ওঠা দিল্লি মেট্রো; যা বর্তমানে ৪১৬ কিলোমিটার বিস্তৃত হয়ে টোকিও সাবওয়ে নেটওয়ার্ককেও ছাড়িয়ে গেছে; ভারতের শহুরে জীবনের চিত্র বদলে দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ৮০০ কোটি মার্কিন ডলারের (প্রায় ১.৮ ট্রিলিয়ন ইয়েন) ঋণে আহমেদাবাদ থেকে মুম্বাই পর্যন্ত নির্মিত হচ্ছে ভারতের প্রথম ‘বুলেট ট্রেন’ বা শিনকানসেন প্রকল্প, যা ২০২৭ সালের আগস্ট নাগাদ আংশিক চালুর কথা রয়েছে।
জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোপারেশন (জেবিআইসি)-এর জরিপ অনুযায়ী, টানা চতুর্থ বছরের মতো জাপানি কোম্পানিগুলোর কাছে আগামী তিন বছরের ব্যবসা প্রসারের জন্য ভারত ‘সবচেয়ে সম্ভাবনাময়’ গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এছাড়া জেট্রোর তথ্যানুযায়ী, ভারতে ব্যবসারত ৭৫.৫ শতাংশ জাপানি প্রতিষ্ঠান চলতি অর্থবছরেই মুনাফা অর্জনের আশা করছে। ২০০০ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ভারতে জাপানের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ ৪৮.১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং বর্তমানে বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
অবশ্য ভারতের সঙ্গে সফল কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা জাপানের জন্য সবসময় মসৃণ নয়। ভারতের নিজস্ব বহুমুখী কূটনৈতিক নীতি রয়েছে, যেখানে দেশটি কোনো পরাশক্তির চাপে নতিস্বীকার করে না। যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ চাপ উপেক্ষা করা বা রাশিয়ার সঙ্গে নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করে জ্বালানি বাণিজ্য বজায় রাখা এবং চীন থেকে শর্তসাপেক্ষে বিনিয়োগ গ্রহণের মতো পদক্ষেপগুলো ভারতের এই স্বাধীন অবস্থানেরই প্রমাণ। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দক্ষ মানবসম্পদের সংকট মোকাবিলায় এবং জনসংখ্যা হ্রাসজনিত চ্যালেঞ্জ উৎরাতে ভারতের বাজার, প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞদের ওপর জাপানের আস্থা দিন দিন দৃঢ় হচ্ছে।