২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। শুধু উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, বাস্তবে কতটুকু অর্জিত হচ্ছে, তার ওপর নিয়মিত নজরদারি রাখতে হবে। গতকাল শনিবার পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত এক আলোচনায় সভায় সংগঠনটির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এমন মত দিয়েছেন।
পিপিআরসির বাজেট বিশ্লেষণ’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে হোসেন জিল্লুর বলেন, যেকোনো বাজেটের প্রকৃত পরীক্ষা তার প্রতিশ্রুতিতে নয়, বরং বাস্তবায়নে। এ কারণে বাজেট বাস্তবায়ন কৌশলকে সরকারের শাসন কাঠামোর মধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ত্রৈমাসিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। এতে বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিতা এবং প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ ছাড়া বাজেটের লক্ষ্য অর্জন কঠিন। তিনি মনে করেন, দেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে দীর্ঘদিন ধরে তিনটি বড় সমস্যা বাধাগ্রস্ত করছে—দুর্নীতি, বাস্তবায়নে বিলম্ব ও ব্যর্থতা এবং অপ্রয়োজনীয় দপ্তর ও প্রকল্পের কারণে সৃষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক অপচয়। এসব সমস্যা সমাধান না হলে বাজেটের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাবে না।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শক্তিশালী গতি এবং অধিকতর স্বচ্ছতা ছাড়া উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কতটুকু সম্ভব, সে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি রাজস্ব প্রশাসনে প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়নের গতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, রাজস্ব মূলত একটি কার্যকর অর্থনীতি থেকেই আসে। উৎপাদনশীল খাত ও বেসরকারি উদ্যোগগুলো প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে রাজস্ব আহরণ স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে।
একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক তরুণকে একাধিক কাজ করতে হচ্ছে, এমনকি কেউ কেউ খরচ সামলাতে এক বেলা কম খাচ্ছেন। তিনি বলেন, শুধু ঢাকা শহরের চিত্র দেখে দেশের সামগ্রিক অবস্থা মূল্যায়ন করা যাবে না। রাজধানীর বাইরের অঞ্চলে মানুষের কষ্ট ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বেশি দৃশ্যমান।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. এ. সাত্তার মণ্ডল বলেন, কৃষি খাতে সহায়তা অব্যাহত থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও দীর্ঘমেয়াদি কৃষি উন্নয়ন কৌশলের ঘাটতি রয়েছে। তিনি স্মার্ট কৃষি, প্রযুক্তিগত অভিযোজন এবং কৃষির আধুনিকায়নের ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা খাতে আরও কার্যকর বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মালালা ফান্ডের সাবেক কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ মুশাররফ তানসেন শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ বৃদ্ধি সত্ত্বেও এ বরাদ্দ শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল উন্নয়নে কতটা ভূমিকা রাখবে, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞানের বিদ্যমান ঘাটতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মূল চ্যালেঞ্জ বাজেটের আকারে নয়, বরং সম্পদের কার্যকর ব্যবহারে। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল পেতে হলে শেখার মান উন্নয়ন এবং শিক্ষাদানের গুণগত পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হবে।