إِنَّ الْعَيْنَ تَدْمَعُ وَالْقَلْبَ يَحْزَنُ وَلاَ نَقُولُ إِلاَّ مَا يَرْضَى رَبُّنَا
“নিশ্চয়ই চোখ অশ্রু ঝরায়, হৃদয় ব্যথিত হয়; কিন্তু আমরা এমন কিছু বলি না, যা আমাদের প্রতিপালককে অসন্তুষ্ট করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩০৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩১৫)
এই একটি বাক্যতেই রয়েছে ইসলামের শোক-দর্শনের সারকথা। শোক থাকবে, কান্না থাকবে, হৃদয় ভারী হবে—কিন্তু অভিযোগ থাকবে না, হতাশা থাকবে না, সীমালঙ্ঘন থাকবে না। জাতীয় শোকের ক্ষেত্রেও এই নীতিই প্রযোজ্য।
ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, শোকের আসল পরীক্ষা আসে প্রথম মুহূর্তে। মহানবী (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন:
إِنَّمَا الصَّبْرُ عِنْدَ الصَّدْمَةِ الأُولَى
“প্রকৃত সবর তো প্রথম আঘাতের মুহূর্তেই।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২৮৩)
জাতীয় পর্যায়ের কোনো প্রিয় ব্যক্তিত্বের মৃত্যুর খবর যখন আসে, তখন আবেগের ঢেউ সমাজকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। সে মুহূর্তেই মানুষ কী বলে, কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়; সেটাই নির্ধারণ করে সে সবরের পথে আছে, না কি আবেগের বশবর্তী হয়েছে।
কোরআন ও হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়; বড় ক্ষতিই অনেক সময় বড় পরীক্ষার নাম।
একজন বড় ব্যক্তিত্বের ইন্তেকাল জাতির জন্য সেই রকমই একটি পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় প্রশ্ন হলো; আমরা কি কেবল আবেগে ভেঙে পড়ব, নাকি আত্মসমালোচনায় দাঁড়াব? আমরা কি শুধু শোক করব, নাকি তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ, মূল্যবোধ ও দায়িত্বগুলো ধারণ করার চেষ্টা করব?
ইসলাম শোকের মুহূর্তে একটি বাক্যকে ঈমানের ঘোষণা হিসেবে তুলে ধরেছে— “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।”
মহানবী (সা.) বলেছেন, কোনো মুমিন বিপদে পড়ে এই বাক্য উচ্চারণ করলে এবং আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা করলে, আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম প্রতিদান দান করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯১৮)
এ বাক্য শুধু মুখের উচ্চারণ নয়; এটি একটি দর্শন। এর অর্থ—আমরা আল্লাহরই, আমাদের প্রিয় মানুষগুলোও আল্লাহরই; ফিরে যাওয়াও তাঁর কাছেই। এই উপলব্ধি জাতীয় শোককে হতাশা থেকে বের করে এনে আত্মশুদ্ধির পথে নিয়ে যায়।
ইসলামের দৃষ্টিতে, কোনো মহান ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা প্রদর্শন হলো; তার আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখা। অশ্রু একদিন শুকিয়ে যায়, শোকের ব্যানার নামিয়ে নেওয়া হয়; কিন্তু আদর্শ ধারণ না করলে শোক কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে।
সবর মানে নিষ্ক্রিয়তা নয়; বরং সবর মানে দায়িত্ব গ্রহণ, আত্মসংযম এবং ভবিষ্যতের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাওয়া।
ইসলাম আমাদের শেখায়; মৃত্যু মানুষকে থামিয়ে দেয়, কিন্তু আদর্শকে থামাতে পারে না। আর সবরের শিক্ষা সেই আদর্শকে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।