এ অবস্থায় রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, পরিবার, সব স্তরেই আমাদের খোলামেলা ও গভীর আলোচনা প্রয়োজন।রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্পেশাল টাস্কফোর্স তৈরি করা প্রয়োজন, যারা প্রচলিত অর্থনীতি ও ইসলামী অর্থনীতির সমন্বয়ে এই সংকটকালে নানা সমাধানে কাজ করার পরামর্শ দেবে। ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন সংকটকালে গণমানুষের মৌলিক চাহিদা—খাদ্য ও চিকিৎসা নিশ্চিতকরণে নানা কার্যকর পদক্ষেপের নজির আছে।
(সুরা : ফুরকান, ২৫:৬৭)
আজকের বাস্তবতায় এই ভারসাম্যই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—না আতঙ্কে সব বন্ধ করে দেওয়া, না বেপরোয়াভাবে চলা; বরং হিসাবি, সংযমী ও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, সব ধরনের হারাম আয় থেকে সম্পূর্ণরূপে বের হয়ে আসা। হারাম আয় বাহ্যিক পরিমাণে হয়তো বেশি দেখা যায়, কিন্তু তা বারাকাহ নষ্ট করে দেয়। আর বারাকাহ কী জিনিস, তা মানুষ সবচেয়ে বেশি অনুভব করে মুসিবত ও সংকটের সময়ে। যখন আয় কমে যায়, বাজার অস্থির হয়, অসুস্থতা বা অনিশ্চয়তা বাড়ে, তখন অল্প সম্পদেও নিরাপদ থাকা, অল্প উপার্জনেও প্রয়োজন মিটে যাওয়া, সামান্যতে শান্তি পাওয়া—এসবই বারাকাহর প্রকাশ। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহ রিবা/সুদকে ধ্বংস করেন এবং দান-সদকা বৃদ্ধি করেন।’
(সুরা : বাকারা, ২:২৭৬)
চতুর্থত, দান-সদকা বাড়িয়ে দেওয়া। এ ধরনের সময়েই দান-সদকার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। একদিকে দান-সদকা সম্পদে সুরক্ষা ও বরকত আনে, অন্যদিকে সমাজের দুর্বল মানুষকে টিকিয়ে রাখে। সংকটের সময় সবচেয়ে আগে আক্রান্ত হয় নিম্নবিত্ত মানুষ, দিন আনে দিন খায় এমন পরিবার, একক উপার্জননির্ভর পরিবার, ছোট ব্যবসায়ী, দিনমজুর, অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা। তাই আমাদের আশপাশের প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, কর্মচারী, সহকর্মী, কারা কষ্টে আছে, তা খোঁজ নেওয়া খুব জরুরি। বিপদের সময় একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোই সমাজকে টিকিয়ে রাখে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘দান-সদকা কোনো সম্পদ কমিয়ে দেয় না।’
(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পাবে বলে তোমরা যে সুদ দাও, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না। পক্ষান্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তোমরা যে জাকাত দাও (তা-ই বৃদ্ধি পায়); বস্তুত তারাই হচ্ছে দ্বিগুণ লাভকারী।’
(সুরা : রুম, ৩০:৩৯)
পঞ্চমত, কৃত্রিম সংকট তৈরি না করা। ব্যবসায়ীদের জন্য এটি একটি বড় আমানত। অপ্রয়োজনে মূল্যবৃদ্ধি, মজুদদারি, কৃত্রিম ঘাটতি সৃষ্টি, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করা, এসব শুধু অনৈতিক নয়, শরিয়াহর দৃষ্টিতেও নিন্দনীয়। অনিশ্চিত সময়ে বাজারকে আরো অস্থিতিশীল করে তোলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মজুদদারি করে, সে গুনাহগার।’
(মুসলিম, হাদিস : ১৬০৫)
ষষ্ঠত, প্যানিক বাইং থেকে বিরত থাকা। ব্যক্তি পর্যায়ে অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত জিনিস মজুদ করতে শুরু করে। এতে নিজের জন্য সাময়িক নিরাপত্তার অনুভূতি এলেও সামগ্রিক বাজারে অস্বাভাবিক চাহিদা তৈরি হয়, সরবরাহে চাপ পড়ে এবং সংকট আরো ঘনীভূত হয়। তাই প্রয়োজনমাফিক কেনাকাটা করা, অযথা আতঙ্কে আচরণ না করা এবং অন্যদের জন্যও বাজারকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করা, এটিও দায়িত্বশীল আচরণের অংশ।
সপ্তমত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে মনোযোগী হওয়া। ব্যক্তিগত ঘর থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত, সব জায়গায় সাময়িকভাবে হলেও আরো সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কোথায় বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে, কোথায় যাতায়াতে সাশ্রয় করা যায়, কোথায় বিকল্প পদ্ধতি নেওয়া যায়, এসব বাস্তবভাবে ভেবে দেখা দরকার।
সব শেষে বলা যায়, এ সময় আমাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয় মহান আল্লাহ। বিশ্লেষণ দরকার, পরিকল্পনা দরকার, কৌশল দরকার, কিন্তু সবকিছুর ওপরে দরকার দোয়া, তাওবা, ইস্তিগফার এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করে না।’
(সুরা : ত্বালাক, ৬৫:২-৩)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। মুসলিম বিশ্বকে নিরাপদ রাখুন। আমাদের রিজিকে বরকত দিন। আমাদের সিদ্ধান্তে হিকমত দিন। আমাদের হালাল, সংযমী, দায়িত্বশীল জীবন যাপনের তাওফিক দিন। আর এই ফিতনা, অস্থিরতা, বিভক্তি, দুর্বলতা ও বৈশ্বিক বিপর্যয় থেকে উম্মাহকে উত্তমভাবে বের করে আনুন। আমিন।