এদিকে ২০২১ সালে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের পর সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইং ক্ষমতা আরো শক্ত করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থন তাকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সহায়তা করেছে। সম্প্রতি আয়োজিত নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ নিতে না পারায় মিন অং হ্লাইং নিজেকে বৈধ নেতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন।
ফলে যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা হাজারো মানুষের মতো মে সোটে থাকা এসব শরণার্থীর ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তারা দেশে ফিরতে চান, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সুযোগ এখনো দেখছেন না। তিনি আরো বলেন, পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে স্বজনদের অসহায় অবস্থায় রেখে যেতে চাননি। তিনি বলেন, ‘তাই আমি সশস্ত্র সংগ্রাম ছেড়ে দিয়েছি। শুধু অস্ত্রের লড়াই নয়, রাজনীতির পথ থেকেও সরে এসেছি। এখন আমি অন্যভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই।’
বর্তমানে তিনি থাইল্যান্ডের সীমান্ত শহর মে সোটের একটি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে শিশুদের পড়ান। পাশাপাশি কারাগারে থাকা বন্ধুদেরও বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি তাদের আশা দিতে চাই যে সংগ্রাম এখনো শেষ হয়ে যায়নি। একদিন আমরা অবশ্যই সফল হব।’
বিবিসির সাংবাদিকরা আশ্রয়কেন্দ্রে গেলে সেখানে থাকা আরো অনেক আশ্রয়প্রার্থী তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানান। প্রত্যেকের গল্পই ছিল যুদ্ধ, নির্যাতন ও দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসার কষ্টে ভরা। সেখানে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করা গণপ্রতিরক্ষা বাহিনীর (পিডিএফ) সাবেক সদস্য, অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) একজন কর্মকর্তা এবং বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ এড়িয়ে পালিয়ে আসা কয়েকজন তরুণও ছিলেন।
তাদের সবার অভিজ্ঞতা ভিন্ন হলেও একটি বিষয়ে তারা একমত। তারা এখনো মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। তবে টানা পাঁচ বছরের সংঘাতে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত। এখন তাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করা। তাই থাইল্যান্ডের সীমান্ত শহর মে সোটই তাদের কাছে নতুন জীবনের একমাত্র আশ্রয় হয়ে উঠেছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন ২০ বছর বয়সী ইন ইন অং। তার সঙ্গে ছিলেন স্বামী ও ছোট ছেলে। তারা মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চল থেকে প্রায় এক হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে মে সোটে পৌঁছেছেন। সাগাইং ছিল সামরিক অভ্যুত্থানবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি। তাই এলাকাটি বারবার বিমান হামলা ও সামরিক অভিযানের শিকার হয়েছে।
ইন ইন অং জানান, তাদের গ্রাম হটোমার একটি সামরিক ঘাঁটি ও বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার মাঝখানে ছিল। একদিন হঠাৎ ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর গুলির শব্দ শোনা যায় এবং লোকজন চিৎকার করে বলতে থাকে, সেনাবাহিনী গ্রামে ঢুকছে। তিনি বলেন, ‘আমরা তাড়াহুড়ো করে পালিয়ে যাই। বেশি কিছু নেওয়ার সুযোগ ছিল না। বাবা শুধু এক ব্যাগ চাল নিয়েছিলেন, যাতে অন্তত খেতে পারি। এরপর আমরা জঙ্গল ও পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নিই।’
জঙ্গলে তাদের জীবন ছিল খুবই কষ্টের। তারা নদীর পানি পান করতেন, সেই পানিতেই গোসল ও অন্যান্য কাজ সারতেন। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন, কেউ কেউ মারা যান। তবুও তারা ছয় মাস জঙ্গলে কাটান। পরে সেনারা গ্রাম ছেড়ে গেলেও কেউ ফিরে যাওয়ার সাহস পাননি। ইন ইন অং বলেন, গ্রামটি লুট করা হয়েছিল এবং বাড়ির আশপাশে ল্যান্ডমাইন পেতে রাখা হয়েছিল।
জঙ্গলে থাকার সময়ই তিনি একটি সন্তানের জন্ম দেন। পরে চিকিৎসকেরা জানান, তার ছেলের হার্নিয়া হয়েছে এবং অস্ত্রোপচার করাতে হবে। এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন এলাকা পেরিয়ে পরিবারটি ছয় মাস আগে মে সোটে পৌঁছায়। প্রথম আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ায় এখন তারা আরেকটি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকছেন। ছেলের চিকিৎসার জন্য টাকা জমানোর উদ্দেশ্যে তারা ভাড়া বাসা না নিয়ে সেখানেই থাকার চেষ্টা করছেন।
মে সোটের আরেকটি আশ্রয়কেন্দ্রে বিবিসির সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা হয় ইয়াঙ্গুনের এক সাবেক বারটেন্ডারের। পরে তিনি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী দলে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি স্ত্রী ও দুই মাসের সন্তানকে নিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন।
তিনি কারেন রাজ্যে বিদ্রোহী বাহিনীর অন্যতম কার্যকর ইউনিট ‘কোবরা কলাম’-এর সদস্য। সন্তানের জন্মের সময় স্ত্রীকে নিয়ে মে সোটে এলেও তিনি আবার যুদ্ধে ফিরতে চান। তার বিশ্বাস, ‘একদিন এই বিপ্লব সফল হবেই। কারণ সেনাবাহিনী পুরো দেশের মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। যারা জনগণকে রক্ষা করার কথা, তারাই তাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। তাই শেষ পর্যন্ত তারা জিততে পারবে না।’
তার ভাষায়, ‘আমি বিশ্বাস করি, একদিন এই বিপ্লব সফল হবে। সেনাবাহিনী পুরো দেশের মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। যাদের জনগণকে রক্ষা করার কথা, তারাই তাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। তাই শেষ পর্যন্ত তারা জিততে পারবে না।’
তিনি যে ‘কোবরা কলাম’ বাহিনীর সদস্য, তারা দীর্ঘদিনের বিদ্রোহী সংগঠন কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়নের (কেএনইউ) সঙ্গে যৌথভাবে লড়াই করছে। কেএনইউ প্রায় ৮০ বছর ধরে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। তবে চলতি বছরে চীনের চাপের কারণে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র ও প্রযুক্তি সরবরাহ কমে যাওয়ায় তারা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাশিয়া ও চীন থেকে প্রশিক্ষণ ও নতুন সামরিক সরঞ্জাম পেয়ে আরো শক্তিশালী হয়েছে।
নিরাপত্তার কারণে নিজের আসল নাম গোপন রেখে আরেক বিদ্রোহী নিজেকে ‘লুই’ নামে পরিচয় দেন। তিনি আগে ইয়াঙ্গুনের একজন উদ্যোক্তা ছিলেন। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর ব্যবসা ছেড়ে কারেন রাজ্যের বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেন। তিনি বলেন, ‘তখন আমার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি ছিল। তবু মনে হয়েছিল, একজন নাগরিক হিসেবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আমার দায়িত্ব। যদি তখন যোগ না দিতাম, সারা জীবন আফসোস করতাম।’
পরে তিনি সামরিক বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। তবে তিনি সেনাদের বোঝাতে সক্ষম হন, তিনি কারেন জাতিগোষ্ঠীর একজন যোদ্ধা, আইন অমান্য আন্দোলনের সদস্য নন। ফলে তার প্রতি তুলনামূলকভাবে কম কঠোর আচরণ করা হয়।
গত বছর মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আর যুদ্ধে ফেরেননি। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে এখন পরিবারের দায়িত্বই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, ‘প্রথম দুই-তিন বছর আমাদের মনোবল অনেক বেশি ছিল। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সবার জীবনে নতুন দায়িত্ব এসেছে। আমার সন্তানরা বড় হচ্ছে। তাদের ভালো শিক্ষা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আমি নই, অনেকেই এখন একই চাপ অনুভব করছেন।’
এদিকে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোতে ১৩ বছর বয়সী শিশুরাও যোগ দিচ্ছে। থাইল্যান্ডের সীমান্ত শহর মে সোটে একজন সমাজকর্মী এসব শিশুকে উদ্ধার করে একটি পুরোনো বাড়িতে তৈরি আশ্রয়কেন্দ্রে রাখছেন। সেখানে তাদের পড়াশোনা ও বিভিন্ন কাজ শেখানোর মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এই পরিবর্তন সহজ নয়।
অনেক শিশু দীর্ঘদিন যুদ্ধের পরিবেশে থাকায় সামরিক জীবনেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাদের পরিবারের সদস্যরাও এখনও মিয়ানমারে যুদ্ধ করছেন। তাই অনেকেই মনে করে, পরিবারের পাশে থেকে লড়াই করাই তাদের দায়িত্ব। ওই সমাজকর্মী বলেন, ‘কখনও কখনও এই বিপ্লব নিয়ে আমি হতাশ হয়ে পড়ি। আগে যেসব গ্রাম একে অপরের বন্ধু ছিল, এখন তারা বিভক্ত। একটি গ্রাম সেনাবাহিনীকে সমর্থন করছে, আর অন্যটি প্রতিরোধ বাহিনীকে।’
তার মতে, শুধু অস্ত্র দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘এটি দীর্ঘমেয়াদি লড়াই। তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়েও এখন থেকেই ভাবতে হবে।’ এদিকে, শরণার্থী ইন ইন অং নতুন সংকটে পড়েছেন। মে সোটের একটি বেসরকারি হাসপাতাল তার ছোট ছেলের হার্নিয়ার অস্ত্রোপচারের জন্য ৩৮ হাজার থাই বাথ (প্রায় ১১৪০ মার্কিন ডলার) চেয়েছে। কিন্তু এত টাকা জোগাড় করা তার পরিবারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
থাইল্যান্ডে সরকারি স্বীকৃতি না থাকায় তারা দেশটির সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুবিধাও পান না। ইন ইন অং বলেন, তিনি নিজের গ্রামে ফিরতে চান। তবে যতদিন মিয়ানমারের সামরিক নেতা মিন অং হ্লাইং ক্ষমতায় থাকবেন, ততদিন দেশে ফেরার সাহস নেই।
তার ভাষায়, ‘আজকের এই পরিস্থিতির জন্য তিনিই দায়ী। তিনি ক্ষমতায় থাকলে আমরা নিরাপদে ফিরতে পারব না। সুযোগ পেলে আমি আমার বাবা-মাকেও থাইল্যান্ডে নিয়ে আসতে চাই।’
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনারের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের আগস্টে নির্বাচন ঘোষণার পর থেকে এ বছরের জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত অন্তত ৭০২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু এবং তাদের অনেকেই বিমান হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অস্ত্রের সংকট ও নানা সমস্যার কারণে প্রতিরোধ বাহিনী কিছু এলাকায় দুর্বল হয়ে পড়লেও এখনও তারা দেশের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর কূটনৈতিক উদ্যোগেও এখন পর্যন্ত সামরিক সরকারের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো ছাড় আদায় করা যায়নি। ফলে মে সোটে আশ্রয় নেওয়া লাখো মিয়ানমার নাগরিকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ইন ইন অং এখন স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে একটি ছোট, অল্প আলোযুক্ত ঘরে থাকেন। সেখানে একটি সাধারণ বাথরুম ছাড়া তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। একই আশ্রয়কেন্দ্রের আরো ১৯টি পরিবারের অবস্থাও প্রায় একই। সবাই যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি বুকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। আর কয়েক মাসের মধ্যেই ইন ইন অংকে আবার নতুন আশ্রয় খুঁজতে হতে পারে।