গত ১৩ নভেম্বর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রায় ঘোষণার এই দিন ধার্য করেন। মামলার অন্য দুই আসামি হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক পুলিশ প্রধান (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে এই মামলার বিচারকাজই প্রথম শেষ হতে যাচ্ছে।গত ২৩ অক্টোবর প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের আইনি যুক্তিতর্ক শেষ হলে ট্রাইব্যুনাল এ মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখেন। সেদিন ট্রাইব্যুনাল বলেছিলেন, ‘১৩ নভেম্বর রায় ঘোষণার তারিখ ঘোষণা করা হবে। তবে সেটা (রায় ঘোষণা) হবে খুব তাড়াতাড়ি।’ সেই ধারাবাহিকতায় গত ১৩ নভেম্বর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল ১৭ নভেম্বর (সোমবার) রায়ের দিন ঘোষণা করেন।ট্রাইব্যুনালের দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। রায়ের তারিখ ঘোষণার আগে মামলার একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় তোলা হয়।
রায়ের তারিখ ঘোষণার পর চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘দীর্ঘ পরিক্রমা শেষে, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি এখন রায়ের জন্য প্রস্তুত হয়েছে। ইনশাল্লাহ আগামী ১৭ নভেম্বর এই মামলাটির রায় ঘোষিত হবে।প্রসিকিউশন, তদন্ত সংস্থা, ভুক্তভোগী পরিবার, সাক্ষী এবং নেপথ্যে থেকে মামলার বিচারকাজ শেষ করতে যারা সহযোগিতা করেছন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, ‘আমরা অঙ্গীকার করেছিলাম যে যারাই বাংলাদেশে যত শক্তিশালী হোক না কেন, যদি কেউ অপরাধ করে, মানবতাবিরোধী অপরাধ করে, তাদের সঠিক পন্থায় বিচারের মুখোমুখী করা হবে। তাদের আইন অনুযায়ী যে প্রাপ্য, এটা তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সেই প্রক্রিয়ায় আমার দীর্ঘ একটি যাত্রা শেষ করেছি। আমরা এখন চূড়ান্ত পর্বে উপনীত হয়েছি।
রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর বিশ্বাস খালাস পাবেন হাসিনা : কামাল
রায়ের তারিখ ঘোষণার পর শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিয়োজিত আইনজীবী মো. আমির হোসেনও গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা পেয়েছেন উল্লেখ করে এই আইনজীবী সেদিন বলেন, ‘আমার প্রত্যাশা আমার ক্লায়েন্টরা (মক্কেলরা) খালাস পাবেন। এটা আমি বিশ্বাস করি।’ বিচারকাজ শেষ করে মামলাটি রায়ের পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের ধন্যবাদ জানান আইনজীবী আমির হোসেন।
গত বছরের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। এরপর চলতি বছরের ২৫ মে থেকে ৮ অক্টোবরের মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধে যেসব মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে, তার মধ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলা আটটি। এর মধ্যে পাঁচটি মামলায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেছেন ট্রাইব্যুনাল। বিচারাধীন পাঁচটি মামলার মধ্যে শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে এই মামলাটি ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় মামলা।
রক্তক্ষয়ী লাগাতার আন্দোলনে গত বছর ৫ আগস্ট পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের। এরপর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে গঠন করা হয় অন্তর্বর্তী সরকার। জুলাই অভ্যুত্থানে পতিত সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে দাবি করে অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা দেয়, এই অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা হবে। ঘোষণা অনুযায়ী পরে ট্রাইব্যুনাল, প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা পুনর্গঠন করা হয়।
পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনাল গত বছর ১৭ অক্টোবর দুই মামলার বিষয়ে প্রথম শুনানি হয়। সেদিন প্রসিকিউশনের আবেদনে ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ এই ৪৬ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। তার আগে গত বছর ১৪ আগস্ট শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দাখিল করা হয়। তদন্ত শুরু হয় গত বছর ১৪ অক্টোবর।
ছয়মাস ২৮ দিনে তদন্ত শেষ করে গত ১২ মে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। আসামিদের বিরুদ্ধে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলি (ঊর্ধ্বতনের নির্দেশনার দায়), হত্যা, হত্যা চেষ্টা, ব্যপক মাত্রায় পদ্ধতিগত হত্যা, অপরাধে প্ররোচনা, উষ্কানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, ষড়যন্ত্রসহ অন্যান্য অমানবিক আচরণ, সংঘটিত অপরাধ প্রতিহত না করার মত মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগে অভিযোগ আনা হয়।
গত ১ জুন প্রসিকিউশন ‘আনুষ্ঠানিক অভিযোগ’ দাখিল করলে তা আমলে নেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে আত্মসমর্পণ করতে ১৬ জুন সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরদিন সেই বিজ্ঞপ্তি দুটি জাতীয় সংবাদপত্রে ছাপা হয়। আত্মসমর্পণ না করায় তাঁদের পলাতক দেখিয়ে গত ১০ জুলাই মামলার অভিযোগ অভিযোগ করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। তাঁদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী মো. আমির হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওইদিন আসমি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন এ মামলার রাজসাক্ষী হতে ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন করেন।
পরে তাঁর আবেদন মঞ্জুর করা হয়। গত ৩ আগস্ট চিফ প্রসিকিউটরের সূচনা বক্তব্যের মধ্যদিয়ে দিয়ে শুরু হয় বিচার কাজ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ ২৮ কার্যদিবসে ৫৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাক্ষ্য দেন এ মামলায়। রাজসাক্ষী হিসেবে গত ২ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্য দেন আসামি চৌধুরী মামুন।
গত ৮ অক্টোবর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হলে ১২ অক্টোবর থেকে শুরু হয় যুক্তিতর্ক। টানা পাঁচদিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। গত ১৬ অক্টোবর প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শেষ হলে ২০ অক্টোবর থেকে আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী টানা তিনদিন শেখ হাসিনা-কামালের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।
সেই ধারাবাহিকতায় গত ২৩ অক্টোবর পাল্টা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন দুই পক্ষই। তার আগে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান ট্রাইব্যুনালে সমাপনী বক্তব্য রাখেন। সেদিন ট্রাইব্যুনাল জানিয়ে দেন গতকাল বৃহস্পতিবার রায়ের তারিখ ঘোষণা করা হবে।