অবশেষে চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা আসে অত্যন্ত কঠোর ভাষায়। সেখানে বলা হয়: ‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্য নির্ণায়ক তীর—এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং এগুলো পরিহার করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।” (সুরা আল-মায়িদা: ৯০) এখানে মদকে সরাসরি “রিজস” (নাপাক) এবং “আমালে শাইতান” বলা হয়েছে—যা ইসলামে নিষেধাজ্ঞার সর্বোচ্চ স্তর।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মদের ব্যাপারে এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা অন্য অনেক গুনাহের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। হাদিসে মদকে বলা হয়েছে—
“الخمر أم الخبائث”
“মদ সব অশ্লীলতা ও অনিষ্টের মূল।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২২৩)
অন্য হাদিসে এসেছে—
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ فِي الدُّنْيَا ثُمَّ لَمْ يَتُبْ مِنْهَا حُرِمَهَا فِي الآخِرَةِ.
‘আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দুনিয়ায় মদ পান করেছে অতঃপর তাত্থেকে তওবা করেনি, সে আখিরাতে তাত্থেকে বঞ্চিত থাকবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৭৫)
আরেক হাদিসে আরও কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে—
وَلاَ يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ
“মদ পানকারী যখন মদ পান করে, তখন সে ঈমানদার অবস্থায় থাকে না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৭৫) অর্থাৎ মদ মানুষকে সাময়িকভাবে হলেও ঈমানের নূর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
শুধু মদ্যপ নয়, অপরাধের দায় পুরো চেইনের
ইসলামের দৃষ্টিতে মদ ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের দায় কেবল পানকারীর ঘাড়ে চাপিয়ে দায়মুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। বরং এর উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিপণন, প্রচার ও সেবন—পুরো চেইনটাই একটি সমন্বিত অপরাধ। কারণ এই শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপই মানববুদ্ধি, নৈতিকতা ও সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। যার জন্য ইসলাম শুধু পানকারীকে নয়, বরং মদের পুরো চেইনকেই অপরাধী হিসেবে গণ্য করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي الْخَمْرِ عَشَرَةً عَاصِرَهَا وَمُعْتَصِرَهَا وَشَارِبَهَا وَحَامِلَهَا وَالْمَحْمُولَةَ إِلَيْهِ وَسَاقِيَهَا وَبَائِعَهَا وَآكِلَ ثَمَنِهَا وَالْمُشْتَرِيَ لَهَا وَالْمُشْتَرَاةَ لَهُ . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ مِنْ حَدِيثِ أَنَسٍ . وَقَدْ رُوِيَ نَحْوُ هَذَا عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ وَابْنِ مَسْعُودٍ وَابْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم .
আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, মদের সাথে সম্পৃক্ত দশ শ্রেণীর লোককে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিসম্পাত করেছেন। এরা হল-
১. মদ তৈরিকারী,
২. মদের ফরমায়েশকারী,
৩. মদ পানকারী,
৪. মদ বহনকারী,
৫. যার কাছে মদ বহন করা হয়, (যার কাছে সংরক্ষণ করা হয়)
৬. যে মদ পরিবেশন করে,
৭. যে মদ বিক্রি করে,
৮. যে মদের মূল্য ভোগ করে,
৯. যে মদ ক্রয় করে,
১০. যার জন্য ক্রয় করা হয়।”
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২৯৫)
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদের সঙ্গে জড়িত দশ শ্রেণির মানুষকে অভিশাপ দিয়েছেন, তখন তিনি আসলে একটি নীতিগত ঘোষণা দিয়েছেন—সমাজে কোনো অপরাধ টিকে থাকে তখনই, যখন তার পেছনে একটি কাঠামো কাজ করে। তাই ইসলাম অপরাধীর একক আচরণ নয়; বরং অপরাধ উৎপাদনকারী ব্যবস্থাকেই ভেঙে ফেলতে চায়।
আজ যারা অবৈধভাবে মদ উৎপাদন করছে, সীমান্ত দিয়ে পাচার করছে, গোপনে বাজারজাত করছে কিংবা প্রশাসনিক ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে তা ছড়িয়ে দিচ্ছে—তারা প্রত্যক্ষভাবে প্রতিটি মৃত্যুর, প্রতিটি পারিবারিক বিপর্যয়ের অংশীদার। ইসলামের দৃষ্টিতে তারা শুধু আইনভঙ্গকারী নয়; বরং সমাজঘাতক।
মাদকের ব্যাপারে সাহাবি ও সালাফদের বাস্তব অবস্থান
মদ নিষিদ্ধ হওয়ার পর সাহাবায়ে কেরাম যেভাবে তা বর্জন করেছেন, তা ইসলামের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর অধ্যায়। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে-
قَالَ أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ مَا كَانَ لَنَا خَمْرٌ غَيْرُ فَضِيخِكُمْ هَذَا الَّذِيْ تُسَمُّوْنَهُ الْفَضِيخَ فَإِنِّيْ لَقَائِمٌ أَسْقِيْ أَبَا طَلْحَةَ وَفُلَانًا وَفُلَانًا إِذْ جَاءَ رَجُلٌ فَقَالَ وَهَلْ بَلَغَكُمْ الْخَبَرُ فَقَالُوْا وَمَا ذَاكَ قَالَ حُرِّمَتْ الْخَمْرُ قَالُوْا أَهْرِقْ هَذِهِ الْقِلَالَ يَا أَنَسُ قَالَ فَمَا سَأَلُوْا عَنْهَا وَلَا رَاجَعُوْهَا بَعْدَ خَبَرِ الرَّجُلِ
আনাস ইবনু মালিক (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, তোমরা যেটাকে ফাযীখ অর্থাৎ কাঁচা খুরমা ভিজানো পানি নাম রেখেছ সেই ফাযীখ ব্যতীত আমাদের অন্য কোন মদ ছিল না। একদিন আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আবূ ত্বলহা, অমুক এবং অমুককে তা পান করাচ্ছিলাম। তখনই এক ব্যক্তি এসে বলল, আপনাদের কাছে এ সংবাদ এসেছে কি? তাঁরা বললেন, ঐ সংবাদ কী? সে বলল, মদ হারাম করে দেয়া হয়েছে, তাঁরা বললেন, হে আনাস! এই বড় বড় মটকাগুলো থেকে মদ ঢেলে ফেলে দাও। আনাস (রাঃ) বললেন যে, এই ব্যক্তির সংবাদের পর তাঁরা এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেসও করেননি এবং দ্বিতীয়বার পানও করেননি। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৬১৭)
ইসলামিক স্কলারগণের ভাষ্য মতে মদ হারাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সাহাবাগণ মদের পাত্রগুলো রাস্তায় এমনভাবে ঢেলে দিয়েছিলেন যে, মদিনার রাস্তায় মদের স্রোত বয়ে গিয়েছিল। কেউ প্রশ্ন করেনি যে, আমার স্টক কী হবে, ব্যবসার ক্ষতি হবে কি না। বরং আল্লাহর নির্দেশই ছিল তাদের কাছে চূড়ান্ত।
মুসলিম স্কলারদের দৃষ্টিতে মদ ও মাদক
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমদ; চার মাজহাবই একমত যে, যেকোনো নেশাজাত দ্রব্য, তা তরল হোক বা কঠিন; সেটি হারাম।
ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন—‘যে বস্তু আকল নষ্ট করে, তা মদের অন্তর্ভুক্ত; নাম বা রূপ পরিবর্তনে তার হুকুম বদলায় না।’ (মাজমূ‘ ফাতাওয়া, খণ্ড ৩৪) এ কারণে আধুনিক ড্রাগস—ইয়াবা, হেরোইন, কোকেন; সবই শরিয়তের দৃষ্টিতে মদের চেয়েও ভয়াবহ।
সমাজবিজ্ঞান ও আধুনিক বিজ্ঞানের বিশ্লেষণ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুযায়ী—
• প্রতি বছর বিশ্বে ৩০ লক্ষের বেশি মৃত্যু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অ্যালকোহলজনিত।
• পারিবারিক সহিংসতা, ধর্ষণ, সড়ক দুর্ঘটনার বড় অংশ মদ্যপ অবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
• দীর্ঘমেয়াদে মদ লিভার সিরোসিস, ক্যানসার, মানসিক রোগ ও আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ায়।
সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইমের Social Disintegration Theory অনুযায়ী—নেশা সামাজিক বন্ধন ভেঙে দেয়, ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে নৈতিক সম্পর্ক দুর্বল করে।
ইসলাম যে বিষয়গুলো ১৪শ বছর আগে নিষিদ্ধ করেছে, আধুনিক বিজ্ঞান আজ সেগুলোকে পাবলিক হেলথ ডিজাস্টার হিসেবে চিহ্নিত করছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা ও আমাদের করণীয়
বাংলাদেশে মদ ও মাদক শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি ঈমান, পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের জন্যও হুমকি তৈরি করছে। ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী—
• মাদক কারবার দমন ইবাদতের অংশ।
• সে জন্য নৈতিক শিক্ষা ও পারিবারিক সচেতনতা সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।
• রাষ্ট্র, সমাজ ও আলেম—সবার সম্মিলিত ভূমিকা জরুরি।
মদ ও মাদক মানুষকে ধীরে ধীরে মেরে ফেলে—কখনো শরীর দিয়ে, কখনো বিবেক দিয়ে, কখনো সমাজ দিয়ে। ইসলাম এই ধ্বংসযজ্ঞ আগেই চিনে নিয়েছিল বলেই একে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। আজ বাংলাদেশের বাস্তবতা প্রমাণ করছে—কোরআনের সেই নিষেধাজ্ঞা কেবল ধর্মীয় আদেশ নয়; বরং মানবতার পক্ষের এক চিরন্তন সতর্কবার্তা।
মাদক চেইনের ব্যাপারে নীরব থাকাও অপরাধ
মদ ও মাদক কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতার নাম নয়; এটি একটি সংগঠিত সামাজিক অপরাধ। যে সমাজ শুধু মদ্যপকে ঘৃণা করে কিন্তু মদের কারখানা, গুদাম, পাচারপথ ও গোপন বাজারকে সহ্য করে—সে সমাজ প্রকৃত অর্থে আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার। ইসলাম এই ভণ্ডামিকে স্বীকৃতি দেয় না। তাই কুরআন মদকে শুধু হারাম বলেনি; একে শয়তানের কাজ ঘোষণা করেছে, আর রাসুলুল্লাহ (সা.) অভিশাপ দিয়েছেন সেই পুরো ব্যবস্থার ওপর—যে ব্যবস্থা মানুষকে ধীরে ধীরে অমানুষ করে তোলে।
আজ বাংলাদেশে যখন বিষাক্ত মদে প্রাণ ঝরছে, পরিবার ধ্বংস হচ্ছে, যুবসমাজ আত্মপরিচয় হারাচ্ছে; তখন দায় শুধু সেই পানকারীর নয়, যে হয়তো একসময় হতাশা, দারিদ্র্য বা কৌতূহলের শিকার ছিল। দায় তাদেরও, যারা এই বিষ তৈরি করে, সরবরাহ করে, নিরাপত্তা দেয়, লাভ তোলে এবং নীরবে উপভোগ করে। ইসলামের বিচারে তারা সবাই সমান অপরাধী, সমান জবাবদিহির মুখোমুখি।
ইসলাম আমাদের ওপর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান আবশ্যক করেছে—
১. আকল রক্ষা করা,
২. জীবন রক্ষা করা,
৩. সমাজকে অনাচারমুক্ত রাখা
যে রাষ্ট্র এই তিনটি আবশ্যকীয় বিধান পালনে শিথিল হয়, সে শুধু নাগরিকের কাছে নয়; আল্লাহর কাছেও দায়ী থাকে। আর যে সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে না, সে ধীরে ধীরে অন্যায়ের অংশে পরিণত হয়।
এই মুহূর্তে মদ ও মাদকবিরোধী অবস্থান মানে শুধু ধর্মীয় আনুগত্য নয়; এটি মানবতার পক্ষে দাঁড়ানো, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা এবং রাষ্ট্রীয় বিবেক জাগ্রত করার সংগ্রাম। আইন, প্রশাসন, আলেম, গণমাধ্যম ও পরিবার—সবাই যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করে, তবে এই নীরব বিষের স্রোত থামানো অসম্ভব নয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—আমরা কি শুধু মৃতের সংখ্যা গুনব, নাকি সেই মৃত্যুর কারখানা বন্ধ করার সাহস দেখাব? কোরআন আমাদের পথ দেখিয়ে দিয়েছে, রাসুল (সা.) সতর্ক করে গিয়েছেন।
এখন সিদ্ধান্ত আমাদের; নীরব দর্শক হবো, না সমাজ রক্ষার আমানতদার হবো?