একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও শান্তির পূর্বশর্ত হলো রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হলো দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাব। নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রথম ও প্রধান ব্রত হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা। ক্ষমতা যেন ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার না হতে পারে।
জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার জন্য অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভিনদেশিরা সামান্য ঋণের বিনিময়ে আমাদের ওপর নানা অপ্রাসঙ্গিক এবং আমাদের মূল্যবোধপরিপন্থি শর্ত আরোপ করে; যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর বিপুল অংশ তরুণ। তাদের দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। তবেই অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করা সম্ভব।
স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পার হলেও এখনো নিরাপদ খাদ্য-পানীয় এবং ওষুধের নিশ্চয়তাটুকু করতে পারিনি আমরা। ভেজাল খাদ্য ও ওষুধে দুরারোগ্য ব্যাধি দিনদিন বাড়ছে। মানুষের নিত্যদিনের ব্যয়ের একটা বড় অংশ চলে যায় চিকিৎসার পেছনে। জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তায় নিরাপদ খাদ্য ও ওষুধের নিশ্চয়তা প্রদানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। নাগরিকদের যেন সামান্য চিকিৎসার জন্য বিদেশের মুখাপেক্ষী না হতে হয়, তা নিশ্চিত করা জনপ্রতিনিধিদের কর্তব্য।
ন্যায়বিচার হলো একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা ছাড়া সমাজে শান্তি আনা সম্ভব নয়। ইসলামের ইতিহাসে ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় কোনো স্বজনপ্রীতির স্থান নেই। রাসুল (সা.) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম, যদি মুহাম্মদের মেয়ে ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম’ (বুখারি)। সুতরাং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দল-মত-নির্বিশেষে সবাইকে সমান চোখে দেখতে হবে। একটি আদর্শ রাষ্ট্র তার নিজস্ব শিক্ষা ও সংস্কৃতির ধারক হয়। আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতি ও পাঠ্যপুস্তকে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকতে হবে। ভিনদেশি ও তাদের এজেন্টদের আরোপিত বিজাতীয় অপসংস্কৃতি এবং আমাদের মূল্যবোধপরিপন্থি কোনো কিছু শিক্ষা কারিকুলামে থাকা কাম্য নয়। মনে রাখতে হবে, বাকস্বাধীনতা মানেই অন্যের ধর্ম বা বিশ্বাসকে অবজ্ঞা করা নয়। জনপ্রতিনিধিদের উচিত এমন আইন ও পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাসকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার চোখে দেখা হবে এবং দেশের প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ ধর্ম পালন ও মতপ্রকাশের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবে। পরিশেষে নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আমাদের উদাত্ত আহ্বান— একজন মুসলিম হিসেবে আপনি মহান আল্লাহর বিধি-বিধান দ্বারা শাসিত হবেন এবং সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তা প্রতিফলিত করবেন। পূর্ণ আমানতদারি ও তাকওয়ার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করবেন। কেয়ামতের দিন প্রতিটি দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন রাখাল (দায়িত্বশীল) এবং প্রত্যেককেই তার অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে’ (বুখারি)। জনপ্রতিনিধিরা যদি ক্ষমতাকে আমানত মনে করেন এবং নাগরিকরা যদি নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হন, তবেই একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব ইনশাআল্লাহ।
জুমার মিম্বর থেকে