মেডকেয়ার আই সেন্টারের বিশেষজ্ঞ চক্ষু চিকিৎসক ডা. নন্দিনী সংকর নারায়ণ জানাচ্ছেন, রোজার সময় হালকা ঝাপসা দেখা অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে রোজা রাখলে বিকেলের দিকে চোখে সামান্য ঝাপসা দেখা যেতে পারে। সাধারণত এটি পানিশূন্যতা ও চোখের পানি কম তৈরি হওয়ার কারণে হয়। আর এটি সাময়িকভাবে চোখের ফোকাসে প্রভাব ফেলে।বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই ইফতারের পর পানি পান করলে এই সমস্যা সেরে যায়।চোখ পরিষ্কারভাবে দেখার জন্য একটি স্থিতিশীল টিয়ার ফিল্ম বা চোখের পানি প্রয়োজন। শরীরে পানির ঘাটতি হলে এই টিয়ার ফিল্ম কমে যায়, ফলে চোখ ভারী লাগে বা ঝাপসা দেখা দেয়। রোজার শেষভাগে এই সমস্যা বেশি অনুভূত হয়।
শর্করা কি চোখে প্রভাব ফেলে?
পানিশূন্যতার পাশাপাশি রক্তে শর্করার মাত্রাও চোখের দৃষ্টিশক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডা. নন্দিনী জানান, রক্তে শর্করার মাত্রা ৭০ মি.গ্রা./ডেসিলিটারের নিচে নেমে গেলে সাময়িকভাবে ঝাপসা দেখা, আলো কম মনে হওয়া বা চোখের সামনে কালো দাগ ভাসার মতো সমস্যা হতে পারে।
এর কারণ হিসেবে এ চিকিৎসক বলেন, মস্তিষ্ক ও চোখ সঠিকভাবে কাজ করার জন্য নিয়মিত গ্লুকোজের জোগান প্রয়োজন পড়ে। গ্লুকোজ কমে গেলে মস্তিষ্ক ভিজ্যুয়াল তথ্য ঠিকভাবে প্রক্রিয়া করতে পারে না। বিশেষ করে ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে রমজানে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা ও ভারী ইফতার একসঙ্গে চোখের সূক্ষ্ম রক্তনালিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
রমজানে চোখ বেশি ক্লান্ত লাগে কেন
এই সময়ে চোখ আগের তুলনায় বেশি ক্লান্ত লাগলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কম পানি পান, ঘুমের সময়সূচির পরিবর্তন, দীর্ঘ সময় স্ক্রিন দেখা এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ—সব মিলিয়ে চোখে চাপ পড়ে।
ডা. নন্দিনীর মতে, কম চোখের পলক ফেলা এবং শুষ্ক পরিবেশ চোখের জ্বালা আরো বাড়িয়ে দেয়। ফলে বিকেলের দিকে চোখে জ্বালা, খসখসে ভাব, ব্যথা ও দৃষ্টিশক্তির ওঠানামা দেখা দেয়।
রেটিনা ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব
আবুধাবির মেডিক্যাল ডিরেক্টর ডা. নিকোলা গাজী এবং কর্নিয়া ও রিফ্র্যাকটিভ সার্ভিসের প্রধান ডা. জর্জ কোরেন্ট জানান, রোজা শরীরের বিপাকক্রিয়ার জন্য ভালো হতে পারে। তবে সতর্কতা জরুরি।
রেটিনা বা চোখের পেছনের আলোকসংবেদনশীল অংশ রক্তে শর্করার ওঠানামায় খুব সংবেদনশীল। বিশেষ করে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি থাকলে অতিরিক্ত মিষ্টি দিয়ে ইফতার রক্তনালিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তাই ইফতারে মিষ্টিজাতীয় খাবার এড়িয়ে, জটিল শর্করা, প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পর্যাপ্ত পানি ও প্রোটিনসমৃদ্ধ সেহরি রক্তে শর্করার ওঠানামা কমাতে সাহায্য করে।
যেসব লক্ষণে সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হবেন
চোখের স্বচ্ছ বাইরের স্তর কর্নিয়া পানিশূন্যতায় দ্রুত প্রভাবিত হয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মতো শুষ্ক আবহাওয়ায় এ সমস্যা বেশি দেখা যায়।
ডা. জর্জ কোরেন্ট এবং গ্লুকোমা সার্ভিসের প্রধান ডা. জেসন গোল্ডস্মিথ জানান, রোজার সময় পানির অভাবে ড্রাই আই ডিজিজ বাড়তে পারে। এর লক্ষণগুলো হচ্ছে—
সমাধান হিসেবে ইফতার থেকে সেহরির মধ্যে পর্যাপ্ত পানি পান এবং প্রয়োজনে প্রিজারভেটিভ-ফ্রি কৃত্রিম চোখের পানি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
গ্লকোমা রোগীদের জন্য সতর্কবার্তা
গ্লকোমাকে বলা হয় ‘নীরব দৃষ্টিচোর’। এই রোগে নিয়মিত ওষুধ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা আশ্বস্ত করে বলেন, চোখের ড্রপ রোজা ভাঙে না। কিন্তু একটি ডোজ বাদ গেলেই চোখের ভেতরের চাপ হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে।
ড্রপ দেওয়ার পর চোখের ভেতরের কোণে হালকা চাপ দেওয়ার পরামর্শও দেন তারা, যাতে ওষুধ চোখেই থাকে।
কখন অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যাবেন
রমজানে সামান্য শুষ্কতা বা ঝাপসা দেখা স্বাভাবিক হতে পারে, তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন—
রমজান বা ঈদের পর পর্যন্ত অপেক্ষা করলে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। তাই তাড়াতাড়ি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। নিজে সুস্থ থাকুন, পরিবারকে সুস্থ রাখুন।