বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছাড়লেও শেষ পর্যন্ত লাশ হয়ে ফিরতে হলো পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার মির্জাপুরী উত্তর গ্রামের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান (৩২)-কে। তার রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে। নিহতের বড় ভাই মোঃ মিরাজুল ইসলাম খানজাহান আলী থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়ে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদেশে যাওয়ার কাগজপত্র প্রস্তুতের জন্য প্রায় এক মাস আগে আসাদুজ্জামান খুলনার দাকোপ উপজেলার সুতারখালীর বাসিন্দা আবিদ আনোয়ারের মাধ্যমে ঢাকার একটি ট্রাভেলস এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সেখানে অবস্থান করছিলেন।
পরিবারের দাবি, গত ১৩ জুলাই আসাদুজ্জামান, আবিদ আনোয়ার, রুবেল গাজীসহ মোট চারজন হাঁসের মাংস রান্না করে খাওয়ার পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাদের বমি, পেটব্যথা ও ডায়রিয়া শুরু হয়। এরপর এজেন্সির ম্যানেজার সুমন খুলনার সোনাডাঙ্গা ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন সবুজবাগ এলাকার বাসিন্দা নারগিসকে ফোন করে জানান, চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
খবর পেয়ে নারগিস ঢাকায় যান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অসুস্থদের অবস্থা দেখে তিনি ঢাকার উন্নত কোনো হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দিলেও এজেন্সির পক্ষ থেকে তাদের খুলনায় নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে চারজনকে খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া হয়।
খুলনায় পৌঁছানোর পর অ্যাম্বুলেন্স চালক ডায়রিয়ার রোগী হিসেবে তাদের মীরের ডাঙ্গা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। সেখানে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আসাদুজ্জামানকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে আবিদ আনোয়ার ও রুবেল গাজীর শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ সময় এজেন্সির ম্যানেজার সুমন মীরের ডাঙ্গা হাসপাতালে অবস্থান করেন।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, পুরো ঘটনাটি পরিকল্পিত হতে পারে। তাদের প্রশ্ন, ঢাকায় অসুস্থ হওয়ার পর কিংবা খুলনায় আনার পথে কেন পরিবারের কাউকে জানানো হয়নি? কেন মৃত্যুর পর খবর দেওয়া হলো?
ঘটনার আরও কিছু অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বজনরা। এজেন্সি ম্যানেজার সুমনের দাবি, ঢাকায় অসুস্থ অবস্থায় আসাদুজ্জামান লুঙ্গি নষ্ট করায় সেটি সেখানে ফেলে দেওয়া হয় এবং গামছা পরিয়ে খুলনায় আনা হয়। তবে মীরের ডাঙ্গা হাসপাতালের কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, হাসপাতালে আনার সময় আসাদুজ্জামানকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখা যায়। যদিও নারগিসের ভাষ্য, অ্যাম্বুলেন্সে আসার সময় তিনি আবারও বাথরুম করলে লুঙ্গি ফেলে দিয়ে গামছা পরানো হয়েছিল।
সরেজমিনে খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে জানা যায়, আবিদের শারীরিক অবস্থা তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও রুবেল গাজীর অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল এবং তাকে আইসিইউতে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল।
নিহতের ভাই মোঃ মিরাজুল ইসলাম এই ঘটনার জন্য আবিদ আনোয়ারকে দায়ী করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, অসুস্থ হওয়ার পরপরই পরিবারকে জানানো হলে হয়তো তার ভাইকে বাঁচানো সম্ভব হতো।
ঘটনার পর আরও কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আবিদের বাবা কেন নিজের অসুস্থ ছেলেকে রেখে মীরের ডাঙ্গা হাসপাতালে এজেন্সি ম্যানেজার সুমনের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন—এ প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর তিনি দিতে পারেননি। অন্যদিকে নারগিস জানান, খুলনা সিটি মেডিকেলে আবিদের পাশে পর্যাপ্ত লোকজন থাকায় তিনি সেখানে ছিলেন না। তবে সরেজমিনে দেখা যায়, আবিদের স্ত্রী ও এক আত্মীয় ছাড়া তেমন কাউকে হাসপাতালে উপস্থিত পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। একই খাবার খেয়ে চারজন অসুস্থ হলেও বিদেশগামী দুইজনের মধ্যে আসাদুজ্জামান মারা যান এবং রুবেল গাজীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। অন্যদিকে আবিদ আনোয়ার ও এজেন্সি ম্যানেজার সুমন তুলনামূলক সুস্থ থাকায় বিষয়টি নিয়েও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।
তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। খানজাহান আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) বক্তব্য পাওয়া না গেলেও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মনিরুজ্জামান বলেন, “ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। তদন্ত চলমান রয়েছে।”